প্রথমদিকে পাশ্চাত্যরা (Western) শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে মেনে নিতে ভয় পেত। অপরদিকে, প্রাচ্য (Eastern) এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউরোপে শূন্য ছিল বিতাড়িত কিন্তু ভারতবর্ষে এবং পরবর্তীতে আরব ভূমিতে শূন্যের ব্যবহার ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
আদিম মানুষ বিশ্বাস করত, শূন্যতা আর বিশৃঙ্খলা থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই শূন্যতা পরবর্তীতে আরও একবার রাজত্ব করবে। এই শূন্যতার ভয় থেকেই গ্রিকরা শূন্যকে সহজে গ্রহণ করেতে পারেনি। গ্রিকরা শূন্যের ধারণাকে ঘৃণা করত। এর মূল কারণ ছিল শূন্যজনিত ভয়।
প্রাচীন গ্রিকরা বলতেন, কীভাবে ‘কিছুই না’ কিছু একটা হবে?
জ্ঞান-বিজ্ঞানে গ্রিকদের প্রভাব অতুলনীয়। গ্রিকদের সৃষ্ট জগৎ যার হাতেখড়ি হয়েছে- পিথাগোরাস, অ্যারিস্টটল ও টলেমির হাত ধরে; তাঁদের সৃষ্ট জগৎ (বিজ্ঞান ও দর্শনশাস্ত্র) গ্রিক সভ্যতা পতনের অনেক পরেও টিকে ছিল। শূন্যকে বাদ দিয়ে, গ্রিক দার্শনিকরা তাঁদের চিন্তাভাবনা দিয়ে আমাদের এমন এক বিশ্বজগতের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিল যে বিশ্বজগত টিকে ছিল দুই হাজার বছর ধরে। গ্রিক মহাবিশ্বে বা গ্রিকদের সেই সৃষ্ট জগতে ‘কিছুই না’ বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। এই কারণে, পশ্চিমারা প্রায় দুই হাজার বছর ধরে শূন্যকে মেনে নিতে পারেনি।
গ্রিকরা জ্যামিতিতে দক্ষ ছিল। তবে সংখ্যার ধারণা পেয়েছিল মিসরীয়দের থেকে। তাই তাদের আকৃতি আর সংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দৃশ্যমান ছিল না। শূন্য কোনো ধরনের জ্যামিতিক অর্থের সঙ্গে মিলত না। সেজন্য ওরা শূন্য যোগ করেনি।
অন্যদিকে এরিস্টটল ও পরবর্তী দার্শনিকরা অসীমের ধারণাও বাতিল করে দেন। শূন্য ও অসীমকে সংখ্যা হিসেবে গ্রিক গ্রহণ করেনি। এটাই একমাত্র কারণ, যা গ্রিকদের ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হতে বিরত রেখেছিল। শূন্য পশ্চিমা দর্শনশাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর একটির সাথে বিরোধ সৃষ্টি করেছিল, একটি নীতি যার ভিত্তি ছিল পিথাগোরাসের সংখ্যা-দর্শন। আর পিথাগোরাসের সংখ্যা-দর্শন অনুপ্রাণিত হয়ে এসেছে জেনোর প্যারাডক্স থেকে।
গ্রীক দার্শনিক জেনো মনে করতেন গতি নিছকই একটি ভ্রম এবং তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, পরিবর্তন ও গতি বাস্তব কিছু নয়। জেনো বিশ্বাস করতেন, সবকিছুই এক এবং অপরিবর্তনীয়। তিনি শূন্য আর অসীম উভয়কেই বাতিল করেছিলেন। কারণ এগুলো এরিস্টটলের মতবাদ অনুসারে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার অন্তরায় ছিল। অসীম যেমন গতিশীল বস্তুর ধারণাকে জট পাকিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি শূন্যতার ধারণা আমাদের শিশু মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। সে সময় সমগ্র গ্রিক মহাবিশ্ব একটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ছিল: শূন্যতা বলতে কিছুই নেই।
শূন্যের ধারণা এসেছে প্রাচ্য থেকে— ব্যবিলনের গণিতজ্ঞদের থেকে। আশ্চর্যজনক হলেও ব্যবিলনীয়দের সংখ্যা পদ্ধতি ছিল ৬০ ভিত্তিক। তাদের গণনা যন্ত্রের নাম এবাকাস। এই গণনাযন্ত্রে উপরে-নিচে পাথর গড়ানোর মাধ্যমে স্থান পরিবর্তন করে হিসাব রাখা হয়। সমস্যা হলো, একই চিহ্ন বিভিন্ন সংখ্যা দেখানোর জন্য ব্যবহার করতে হত। সংখ্যাটি কী, তা বোঝার একমাত্র উপায় ছিল চিহ্নের স্থানের পরিবর্তন।
খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে ব্যবলনীয়রা শূন্য ব্যবহার করতে শুরু করে। এসময় শূন্যের কোনো সংখ্যাগত মান/মূল্য ছিল না, শূন্য ছিল সংখ্যার অনুপস্থিতি প্রকাশের/দেখানোর একটি প্রতীক। যেখানে শূন্য ছিল কেবল একটি স্থানধারক মাত্র। ব্যাবিলনীয় গণিতবিদরা তাঁদের ৬-ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে সংখ্যার অনুপস্থিতি বোঝাতে ফাঁকা জায়গা (স্পেস) ব্যবহার করত। সুতরাং এটি তখনো কোনো অর্থ বহন করেনি; সংখ্যারেখায়ও কোনো স্থান পায়নি।
শূন্য দরকারী ছিল বটে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শূন্য নিজে একটি সংখ্যা ছিল না। শূন্য শুধুমাত্র একটি অঙ্ক যা তার বাম দিকের অঙ্ককে সাথে নিয়ে অর্থ প্রকাশ করত। ওই সময়টাতে শূন্যের প্রতীক আক্ষরিক অর্থে কিছুই বোঝাত না। শূন্য স্বতন্ত্রভাবে (এককভাবে) একটি সংখ্যা ছিল না। এমনকি আজও কোথাও কোথাও সেই অর্থহীন শূন্য দেখা যায়। খেয়াল করবেন; আপনার কী-বোর্ডে শূন্য আছে ৯-এর পরে, বর্তমান সংখ্যারেখার মতো ১-এর আগে নয়! অপরদিকে ভারতবর্ষ; শূন্যতার ভয়কে জয় করে শূন্যের এই আমূল ধারণাগুলোর পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট তার পারস্য সৈন্য নিয়ে ব্যাবিলন থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই আক্রমণের মাধ্যমেই ভারতীয় গণিতবিদরা প্রথম ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতি এবং শূন্য সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন ভারত আক্রমণ করেন তখন বাংলাদেশ ‘গঙ্গারিডই’ নামক পরাক্রান্ত রাজ্য ছিল। সে সময় প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন ক্ল্যাসিক্যাল লেখকগণ বঙ্গ অঞ্চলকে গঙ্গারিডই বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। আলেকজান্ডার গঙ্গারিডই রাজ্যের পরাক্রমের কাহিনী শুনে শঙ্কিত হয়ে যমুনার পশ্চিম পাড় থেকেই ফেরত চলে যান। ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ব্যবিলনে তাঁর অকাল মৃত্যু হয়। এরপর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর ঝগড়াটে জেনারেলরা তাঁর সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে বিভক্ত করে! ভারত ভূখণ্ডে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট প্রায় ১৯ মাস অবস্থান করেছিলেন। তিনি ভারত ত্যাগের পর প্রায় দুই বছর ধরে তার বিজিত অঞ্চলে গ্রিক শাসন বজায় ছিল।
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে রোম ক্ষমতায় আসে এবং গ্রিসকে গ্রাস (পরাজিত) করে। কিন্তু রোমের ক্ষমতা আলেকজান্ডারের মতো ভারতবর্ষে প্রসারিত হতে পারেনি। ফলস্বরূপ, প্রত্যন্ত ভারতে খ্রিস্টধর্মের উত্থান এবং খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে রোম সম্রাজ্য পতনের প্রভাব থেকে (ভারতবর্ষ) বিরত ছিল।
একটুখানি ইতিহাস তো হলো। এখন আলোচনায় ফেরা যাক। যা বলছিলাম...
মূলত ভারতবর্ষ অ্যারিস্টটলের দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। যদিও আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট অ্যারিস্টটলের দর্শন ও শিক্ষায় অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি নিঃসন্দেহে ভারতকে অ্যারিস্টটলীয় ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রীক দর্শন কখনই ভারতবর্ষে টিকতে পারেনি। গ্রীকদের দর্শনচর্চায় শূন্যতা ও অসীমের কোনো স্থান ছিল না। অপরদিকে ভারতবর্ষের গণিতবিদদের কখনও অসীম বা শূন্যতার ভয় ছিল না। গ্রীক দর্শনের বিপরীতে, ভারতীয় গণিতবিদরা প্রকৃতপক্ষেই অসীম এবং শূন্যতাকে আলিঙ্গন করে নিলেন!
কিন্তু, ভারতীয় গণিতবিদরা ঠিক কী কারণে অসীম এবং শূন্যতাতে আপন করে নিয়েছিল?
চিত্র : গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর ভাস্কর্য
শূন্যতা হিন্দু ধর্মে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। হিন্দু ধর্মে যেমন আছে সাকার দেবতার স্থান, তেমনি আছে নিরাকার পরম ব্রহ্মের (বলে রাখা ভালো, ব্রহ্ম আর ব্রহ্মা এক নন) স্থান। দ্বৈত-অদ্বৈত, শূন্য-অসীমের বিপরীত ধারণা নিয়ে গড়ে ওঠে হিন্দুদের বিভিন্ন মতবাদ। কিন্তু শূন্যতা থেকে জন্ম হয়েছিল মহাবিশ্বের, একইভাবে জন্ম হয়েছে অসীমের। হিন্দুদের একটি অংশের মতানুসারে মহাবিশ্ব অসীম, যেখানে আমাদের বিশ্বের বাইরেও আলাদা বিশ্ব আছে বলে ধারণা করা হয়।
ভারতীয় গণিতবিদরা শূন্যকে গ্রহণ করার চেয়ে আরও বেশি কিছু করেছেন; তারা শূন্যকে রূপান্তরিত করেছেন। বলা হয়ে থাকে, ভারতীয় গণিতবিদেরা শূন্যকে পুনর্জন্ম করিয়ে নামেমাত্র স্থানধারক থেকে সংখ্যায় ভূমিকায় এনেছেন।
খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে রোম সম্রাজ্য পতনের (৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ) একই বছরে; ভারতবর্ষের এক লেখায় গ্রিক, মিশর ও ব্যাবিলনীয় গণিতশাস্ত্রের পদ্ধতির প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এটি সম্ভব হয়েছিল আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারতে প্রবেশ (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে) করার কারণে।
পঞ্চম শতাব্দীর কোনো এক সময়ে ভারতীয় গণিতবিদেরা তাঁদের সংখ্যা পদ্ধতিতে বিশেষ পরিবর্তন আনেন। তাঁরা গ্রিকদের মতো সংখ্যা পদ্ধতি ছেড়ে অনেকটা ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতির রীতি অনুসরণ করেন। এর সাথে ভারতীয় গণিতবিদেরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। যেখানে ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতি ছিল ৬০ ভিত্তিক সেখানে ভারতীয় গণিতবিদদের তৈরি করা সংখ্যা পদ্ধতি হচ্ছে ১০ ভিত্তিক! আর বর্তমানে আমাদের ব্যবহৃত ডিজিট/অঙ্ক ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি থেকেই পাওয়া।
কেউ সঠিক করে বলতে পারে না, ভারতীয়রা তাদের সংখ্যা পদ্ধতিকে ঠিক কোন সময়টাতে ব্যাবিলনের স্থান-ধারক সংখ্যা পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করে ফেলে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, হিন্দু (ভারতীয়) সংখ্যা পদ্ধতির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় একজন সিরিয়ান বিশপের কাছ থেকে (৬৬২ খ্রিস্টাব্দে) যিনি লিখেছেন, ভারতীয়রা কীভাবে “নয়টি চিহ্নের মাধ্যমে” গণনা করত। নয়টি - দশটি নয়।
বিশপ আবার কী? বিশপ হচ্ছে একজন উচ্চপদস্থ খ্রিস্টান যাজক যার উপর কোন একটি শহর বা জেলার সবগুলো চার্চের দায়িত্বভার থাকে। শূন্যের ব্যাপারে বিশপের লেখায় উল্লেখ ছিল না। কিন্তু নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে ভারতীয় সংখ্যার প্রচলন বিশপের লেখার আগে থেকেই ছিল; সে সময় ভারতীয় পদ্ধতির কিছু রূপের মধ্যে শূন্য উপস্থিত ছিল-এরকম প্রমাণও রয়েছে। যদিও বিশপ এ ব্যাপারে জানত না। যাই হোক, স্থানধারক শূন্যের জন্য একটি ১০ ভিত্তিক চিহ্ন ভারতীয় সংখ্যা ব্যবস্থায় ব্যবহার হয়েছিল নবম শতাব্দীতে। কিন্তু ততদিনে ভারতীয় গণিতবিদরা একটি বিশাল কাজের কাজ করে ফেলেছেন!
ঋণাত্মক সংখ্যার ধারণা প্রথম প্রকাশ পায় ভারতে (এবং চীনে)। সপ্তম শতকের ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত, একটি সংখ্যা দিয়ে অপর সংখ্যাকে ভাগ করার নিয়ম দেখিয়েছিলেন। এমনকি ভাগের ক্ষেত্রে ঋণাত্মক সংখ্যার নিয়ম কেমন হবে সেটাও ব্রহ্মগুপ্ত উল্লেখ করেছিলান। ব্রহ্মগুপ্ত বলেন, “ধনাত্মক সংখ্যা দিয়ে ধনাত্মক সংখ্যা অথবা ঋণাত্মক সংখ্যা দিয়ে ঋণাত্মক সংখ্যা ভাগ করলে ফলাফল হবে ধনাত্মক।” তিনি লিখেছেন, “ধনাত্মক সংখ্যা দিয়ে ঋনাত্মক সংখ্যা ভাগ করলে ফলাফল ঋণাত্মক। ঋণাত্মক সংখ্যা দিয়ে ধণাত্মক সংখ্যা ভাগ করলে ফলাফল হবে ঋণাত্মক।”
এই নিয়মগুলো আমরা এখন সহজেই বুঝি: দুটি সংখ্যার ভাগফল ধনাত্মক হবে যদি সংখ্যা দুটি একই চিহ্ন বিশিষ্ট হয়।
এদিকে সপ্তম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসের সাথে পশ্চিমের বিকাশ স্থিমিত হয়ে যায়। আবার অন্যদিকে ইসলামের বিকাশ শুরু হয়। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর এক দশক পর তাঁর অনুসারীরা মিসর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া ও পার্সিয়া দখল করে। জেরুজালেমের সূর্য অস্তমিত হয়। ৭০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইসলাম পূর্বে সিন্ধু নদ ও পশ্চিমে আলজিয়ার্স পর্যন্ত অগ্রসর হয়। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেন দখলের পর ফ্রান্স পর্যন্ত সীমানা বিস্তৃত করে। ৭৫১ সালে চীনকে পরাজিত করে এবং সেই সাথে ভারতবর্ষ দখল করে। মুসলিমদের অধিপত্য আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর কল্পনার চাইতেও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। চীন জয় করার পথে মুসলিমরা ভারত জয় করে। আরবরা সেখানেই ভারতীয় সংখ্যা সম্পর্কে জানতে পারে এবং ভারতীয় লেখাগুলো আরবিতে অনুবাদ করা শুরু করে।
এদিকে নবম শতাব্দীতে খলিফা আল-মামুন বাগদাদে বড়সড় একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন; দ্যা হাউস অব উইসডম। এটি পূর্ববিশ্বে (প্রাচ্যে) জ্ঞান অর্জনের একটি প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানকার প্রথম দিকের একজন গণিতবিদ ছিলেন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে-মুসা আল-খোয়ারিজমি।
চিত্র : আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে-মুসা আল-খোয়ারিজমি
আল-খোয়ারিজমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেন। যেমন- আল-জাবর ওয়া’ল মুকাবিলা। বইটির বিষয়বস্তু হলো, কীভাবে সরল সমীকরণ সমাধান করতে হয় তার উপর। বইটির নামের প্রথম অংশ ‘আল-জাবর’ কথাটার অর্থ হলো ‘পরিপূর্ণ বা সমাপ্ত করা’ যা থেকে algebra বা বীজগনিত শব্দের উৎপত্তি। তিনি ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে আরও একটি বই লেখেন; কিতাবুল জামা’ওয়াল-তাফরিক ফি হিসাব আল হিন্দ (যোগ-বিয়োগের ভারতীয় পদ্ধতি)। বইটিতে উল্লেখিত সংখ্যা পদ্ধতিটি খুব দ্রুত পুরো আরব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বীজগনিতের পাশাপাশি ভারতীয়দের চট-জলদি গুণ ও ভাগের নিয়ম আরব এবং উত্তর আফ্রিকার স্পেন সহ আরও চারটি দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও অ্যালগরিদম শব্দটি আল-খোয়ারিজমির নাম থেকে এসেছে, যদিও আরবেরা ভারতীয়দের থেকে অংকপাতন (চিহ্ন-পদ্ধতি) নিয়েছিল কিন্তু তারপরেও বাকি বিশ্ব এ পদ্ধতিকে আরবীয় সংখ্যা পদ্ধতি হিসেবে অনূদিত করা শুরু করে। পরবর্তীতে আল-খোয়ারিজমি এ বইটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। যদিও মূল আরবি ভাষার বইটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আরবেরা ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি গ্রহণ করার সাথে সাথে শূন্যকেও গ্রহণ করেছিল। শূন্যের ভারতীয় নাম ছিল ‘শূন্যেয়া’ (śūnya) যার অর্থ “ফাঁকা বা খালি”। ‘শূন্যেয়া’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। আরবেরা ‘শূন্যেয়া’ শব্দের অনুবাদ করে ‘সিফার’ (صِفْر) যার অর্থ “ফাঁকা বা খালি”। যখন পশ্চিমা পণ্ডিতরা নতুন সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করত তখন তারা ‘সিফার’ শব্দটিকে ল্যাটিন ভাষায় পরিবর্তন করে উচ্চারণ করেছিল ‘জেফিরাস’ (zephirus) যা ইংরেজি Zero শব্দের মূল। অন্যান্য পশ্চিমা পণ্ডিতরা শব্দটিতে তেমন কোন পরিবর্তন না এনে ‘জিরো সিফ্রা’ বলেছেন। যেটা পরবর্তীতে ‘সিফার’ হয়েছে। শূন্য সংখ্যা সম্বলিত সবগুলো প্রতীক এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে লোকজন সবগুলো সংখ্যাকে সিফারস বলা শুরু করেছিল। এই ‘সিফারস’ শব্দটি ফারাসি ভাষা হয়ে ‘সিফ্রি’ (chiffre) থেকে অনুবাদ হয়েছে Digit (অংক) শব্দে।
যখন আল-খোয়ারিজমি ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি ও হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে পশ্চিমাবিশ্বকে জানিয়েছিলেন, তখন পশ্চিমারা শূন্যকে না মানার দলে ছিল। এমনকি মুসলিম বিশ্বেও পশ্চিমাদের শিক্ষা অর্থাৎ অ্যারিস্টটলীয় ধারণা জেঁকে বসেছিল।
যাইহোক, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত বিজয়ের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়! ভারতীয় গণিতবিদরা যেমন শূন্যতার প্রতীক হিসেবে শূন্য সংখ্যার ধারণা পরিষ্কার করেছেন, তেমনি মুসলিমদের শূন্যকে গ্রহণ করতে অ্যারিস্টটলীয় ধারণা প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছে। আর এমনটাই হওয়া উচিত ছিল! তাই না?
খ্রিস্টানরা যদিও প্রথমদিকে শূন্যের ধারণাকে নিষিদ্ধ করেছিল, পরে ব্যবসার স্বার্থে সেটাকে গ্রহণ করেছিল।
যে মানুষটি পশ্চিমবিশ্বে শূন্যকে পুনঃপরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি হলেন পিসার লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি, একজন ইতালীয় ব্যবসায়ীর ছেলে। যিনি আমাদের মাঝে ফিবোনাচ্চি বা ফিবোনাক্কি নামে পরিচিত। উত্তর আফ্রিকায় ভ্রমণের সুবাদে গণিতে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি। সেখানে লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি, মুসলিমদের থেকে গণিত শেখেন এবং নিজের প্রচেষ্টায় একজন দক্ষ গণিতজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
চিত্র : লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি
ফিবোনাচ্চি তার বইয়ে উল্লেখ করা একটি মজার ছোট্ট গাণিতিক সমস্যার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১২০২ খ্রিস্টাব্দে ‘লিবার অ্যাবাকি’ (Liber Abaci) বইটিতে তিনি সমস্যাটি লিখেছিলেন।
মনে করো, এক কৃষকের এক জোড়া বাচ্চা খরগোশ আছে। মানে দুইটা বাচ্চা বাচ্চা খরগোশ। বাচ্চাদের পরিপক্ক হতে দুই মাস সময় লাগে এবং তারপর থেকে প্রতি মাসের শুরুতে তারা আরও এক জোড়া খরগোশ জন্ম দেয়।
যেহেতু এই নতুন বাচ্চা বাচ্চা দুইটি খরগোশ আবার পরিপক্ক হবে এবং আবার বাচ্চার জন্ম দেবে এবং সেই বাচ্চা খরগোশগুলো আবার বড় হবে এবং তারাও আবার বাচ্চা জন্ম দেবে এবং এভাবে কোন নির্দিষ্ট মাস শেষে কৃষকটির কত জোড়া খরগোশ থাকবে?
তাহলে প্রথম মাসে,
কৃষকটির এক জোড়া খরগোশ ছিল এবং যেহেতু তারা পরিপক্ক হয়নি, তাই তারা প্রজনন করতে পারে না। দ্বিতীয় মাসে কৃষকটির কাছে তখনও এক জোড়াই আছে।
কিন্তু তৃতীয় মাসের শুরুতে, প্রথম জোড়া দুইটি বাচ্চার জন্ম দেয়: এখন কৃষকটির কাছে মোট খরগোশ হলো চারটি অর্থাৎ দুই জোড়া।
চতুর্থ মাসের শুরুতে, প্রথম জোড়া আবার প্রজনন করে, কিন্তু দ্বিতীয় জোড়া যথেষ্ট পরিপক্ক হয় না: মোট তিন জোড়া।
পরের মাসে অর্থাৎ পঞ্চম মাসে প্রথম জোড়া পুনরুৎপাদন করবে, দ্বিতীয় জোড়াও পুনরুৎপাদন করবে, যেহেতু দ্বিতীয় জোড়া পরিপক্কতায় পৌঁছেছে। তবে তৃতীয় জোড়াটি খুব অল্প বয়সী।
এতে করে হলো দুটি অতিরিক্ত জোড়া খরগোশ: সব মিলিয়ে এখন খরগোশ পাঁচ জোড়া।
খরগোশের জোড়ার সংখ্যা নিম্নরূপ : 1, 1, 2, 3, 5, 8, 13, 21, 34, 55, 89, ... ... ...
অর্থাৎ যে কোনো মাসে কৃষকের কাছে থাকা খরগোশের সংখ্যা হলো আগের দুই মাসের থাকা মোট খরগোশের যোগফল।
গণিতবিদরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ধারার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন।
8÷5 = 1.6
13÷8 = 1.625
21÷13 = 1.61538 ... ... ...
অর্থাৎ এই ধারার যে কোন একটি পদকে তার আগের পদ দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল একটি বিশেষ সংখ্যার কাছে পৌছায়। যাকে বলা হয় সোনালী অনুপাত, এর মান 1.61803 ...
বার শতাব্দীর পর পিসার লিওনার্দ ফিবোনাচ্চি, মূসা আল খোয়ারিজমির বইটি অনুবাদ করেন যা ছিল প্রকৃতপক্ষেই অসাধারণ একটি কাজ।
এদিকে ১২৯৯ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে আরবীয় সংখ্যা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ফলে তারা আরব সভ্যতা থেকে আসা নতুন অতিথি শূন্য সংখ্যার ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন! কিন্তু ব্যবসায়ীরা গোপনে সেগুলো ব্যবহার করতে থাকে, এমনকি গুপ্ত বার্তা আদান-প্রদানেও ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে চাপের মুখে সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং শূন্য ও আরবীয় সংখ্যা পদ্ধতি ইউরোপে গৃহীত হয়।
লিওনার্দো ফিবোনাক্কি তাঁর অনুবাদ করা বইতে শূন্যের চিহ্ন হিসেবে 0 ব্যবহার করেন এবং এই চিহ্ন দিয়ে যোগ, বিয়োগ এবং গুণ করার কথা উল্লেখ করেন কিন্তু তারপরেও তিনি শূন্যকে সংখ্যার মর্যাদা দিতে পারেননি!
তবে, আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত শূন্যকে মূল জায়গা থেকেই সংখ্যার মর্যাদা দিয়েছেন। ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর বইটিতে শুধু শূন্যের কথাই উল্লেখ করেননি বরং শূন্যের সাথে ঋণাত্মক সংখ্যা কিভাবে গণিতের নিয়ম অনুসরণ করবে সেগুলো নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তাঁর নিয়ম আধুনিক বীজগাণিতিক নিয়ম হতে কিছুটা আলাদা হলেও, গুরুত্বের দিক থেকে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক:
সোহানুর রহমান সোহান
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ (এম.এস.সি)
সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
তথ্যসূত্র :
1. Zero: The Biography of a Dangerous Idea by Charles Seife
2. How mathematics happened: The first 50,000 years by Rudman, P.S.
3. সংখ্যা-রাজ্য by সোহানুর রহমান সোহান




0 Comments