১৯১৮ সালের রসায়নে নোবেল পুরষ্কারই সম্ভবত এযাবৎ কালের সকল নোবেল পুরষ্কারের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই বছরে মানবসভ্যতার অন্যতম প্রকট সঙ্কট সমাধানের জন্য জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রিটজ হেবার কাঙ্ক্ষিত নোবেল পুরষ্কারটি লাভ করেছিলেন। তাঁর সেই আবিষ্কার বর্তমান সময়ের প্রায় ৪ বিলিয়ন মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। কিন্তু পুরষ্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে তাঁর নিজের অনেক সহকর্মী উপস্থিত থাকতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্য দুইজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী প্রতিবাদস্বরূপ তাদের নোবেল পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাতেও তাকে নিয়ে নেতিবাচক আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। তাই ফ্রিটজ হেবারকে একইসাথে সর্বকালের অন্যতম প্রভাবশালী এবং দুর্ভাগা বিজ্ঞানী বললেও খুব একটা ভুল হবে না।
ফ্রিটজ হেবার। Image source: Reddit
সম্ভবত হেবারই একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি পৃথিবীকে আমাদের বসবাসের উপযোগী করে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু তার সেই অনবদ্য অবদানটা কি? কেনইবা তাকে সবাই ঘৃণা করত? আসুন ধীরে ধীরে সেগুলো অনুসন্ধান করি।
ধরুন আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক। আপনি একটি দ্বীপের সন্ধান পেলেন যার ভূমি পাখির বিষ্ঠায় পূর্ণ। তাহলে আপনি সেই দ্বীপকে নিজেদের বলে দাবি করতে পারেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারও আপনাকে সেক্ষেত্রে সকল সহযোগিতা দেবে। এমনকি প্রয়োজন পড়লে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পাখির মলে ভরা সেই দ্বীপ দখলে নৌবাহিনী কিংবা সেনাবাহিনীকেও পাঠিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। আমেরিকার ১০ টি দ্বীপ এভাবেই দখল করা হয়েছিল! এমনকি ১৮৫৬ সালে আমেরিকার কংগ্রেসে পাস হওয়া সেই ভূমি দখল আইন এখনও বলবৎ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল ,মানুষ কেন পাখির মলসমৃদ্ধ দ্বীপ খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠল?
পেরুর সমুদ্রসৈকতের পাশে প্রায় কয়েক ডজন দ্বীপ রয়েছে। সেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন সামুদ্রিক পাখি একত্রিত হয়। দ্বীপের নিকটে থাকা সমুদ্রের পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। অগণিত সেই সামুদ্রিক পাখিগুলো সেই মাছ খায় এবং দ্বীপে মলত্যাগ করে। অঞ্চলটি শুষ্ক এবং উষ্ণ হওয়ার কারণে পাখির বিষ্ঠা জমাটবদ্ধ হয়ে সহস্র বছর ধরে সেই দ্বীপের মাটিতেই রয়ে যায়। এমনকি সেই দ্বীপগুলোতে ৩০ মিটার বা ১০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট পাখির বিষ্ঠার স্তূপেরও দেখা মেলে।
মেক্সিকোর Isla Roca Partida Guano Island. Image source; Lasertrimman/WikiCommons CC BY-SA 3.0
পাখির বিষ্ঠাকে বাণিজ্যিকভাবে ‘গুয়ানো’ নামে ডাকা হয়। ১৮ শতাব্দীর মাঝামাঝি গুয়ানো ক্রয়-বিক্রয় একটি লাভজনক ব্যাবসায় পরিণত হয়। সেই সময়ে এক পাউন্ড (প্রায় ০.৪৫ কিলোগ্রাম) গুয়ানো কিনতে ৭৬ ডলার গুনতে হত। আরও সহজে বললে এক পাউন্ড স্বর্ণের বিনিময়ে চার পাউন্ড গুয়ানো কেনা যেত। পাখির বিষ্ঠার এত বড় ব্যবসার মূল কারণটা কি? শুনতে অবাক লাগলেও এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মানবদেহের মাঝে।
ওজনের ভিত্তিতে মানবশরীর মূলত অক্সিজেন, কার্বন এবং হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরি। কিন্তু মানবদেহে প্রাচুর্যের দিক থেকে চতুর্থ মৌল হল নাইট্রোজেন। নাইট্রোজেন অ্যামিনো এসিডের একটি অংশ যা দিয়ে প্রোটিন তৈরি হয়। এছাড়াও রক্তের হিমোগ্লোবিনে নাইট্রোজেন পাওয়া যায় যা লোহিত রক্তকণিকায় অক্সিজেন সরবরাহ করে। এমনকি ডিএনএ এবং আরএনএ গঠনেও নাইট্রোজেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। তাই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ও বিকাশে নাইট্রোজেন অতীব প্রয়োজনীয় একটি মৌল।
মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণী উদ্ভিদ ভক্ষণের সময় তাদের দেহে নাইট্রোজেনের প্রবেশ ঘটে। আর উদ্ভিদ মাটি থেকে নাইট্রোজেন শোষণ করে। কিন্তু সমস্যা হল বছরের পর বছর ধরে একই জমিতে বার বার চাষাবাদের ফলে সেই জমিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কমে যাওয়াতে গাছপালা, খাদ্যশস্যগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এমনকি উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোরোফিল তৈরি করতে পারে না। তাদের পাতার বর্ণ হলুদ হয়ে যায় এবং বিভিন্ন কীটপতঙ্গ এবং রোগ দ্বারা খুব সহজেই আক্রান্ত হয়। তাই চাষযোগ্য জমিতে নাইট্রোজেনের অভাব কৃষকদের জীবনে এক বড় অভিশাপের নাম।
এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের একটাই উপায়। মাটিতে নাইট্রোজেন পুনরায় যোগ করা। গুয়ানোর মূল গুরুত্ব আসলে এখানেই। গুয়ানোতে প্রায় ২০ শতাংশ নাইট্রোজেন রয়েছে। শত শত বছর আগে থেকেই পেরুর ইনকা সভ্যতার কৃষকেরা খেয়াল করেন, মাটিতে গুয়ানো মেশালে তাদের চাষ করা খাদ্যশস্যের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা বিভিন্ন অনুর্বর জমিতে গুয়ানো প্রয়োগ করে চাষাবাদের যোগ্য করে তোলে। আর এর মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যেরও বিস্তার ঘটে।
দক্ষিণ আমেরিকার পাখির বিষ্ঠার এই বিশাল ভাণ্ডারের তথ্য পৃথিবীর অন্য মহাদেশেও পৌঁছে যায়। ১৮৬৫ সালে স্পেন গুয়ানো সমৃদ্ধ দ্বীপগুলো দখলের জন্য পূর্ববর্তী কলোনিসমূহ পেরু, চিলি,ইকুয়েডর ও বলিভিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে গুয়ানোর ব্যাপক ব্যাবহারের ফলে এর পরিমাণ দ্রুত কমতে থাকে। ১৮৭২ সালের দিকে গুয়ানোর পরিমাণ এতটাই কমে যায় যে পেরু সেগুলো বাইরে রপ্তানি করতে অপারগতা প্রকাশ করে। এর ফলে পৃথিবীর মানুষকে নাইট্রোজেনের নতুন উৎস খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়ে।
এটা পৃথিবীর জন্য একটি প্রকট সমস্যায় রূপ নেয়। ব্রিটিশ রসায়নবিদ উইলিয়ামস ক্রুক্স অনুমান করেন নাইট্রোজেনের বিকল্প উৎস খুঁজে না পেলে ৩০ বছরেরও কম সময়ের মাঝে পৃথিবীর জনসংখ্যার একটি বড় অংশ অনাহারে মারা যাবে। তিনি আশা করেন একমাত্র রসায়নবিদ্যা এবং রসায়নবিদদের পক্ষেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
তার এই প্রত্যশ্যার পেছনে বেশ গ্রহণযোগ্য যুক্তিও রয়েছে। পৃথিবীতে নাইট্রোজেন দুর্লভ কোন বস্তু নয়। বরং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি (৭৮%)। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রকৃতিতে নাইট্রোজেন এমন রূপে রয়েছে যেটা প্রাণী বা উদ্ভিদ সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। দুইটি নাইট্রোজেন পরমাণু তিনটি সমযোজী বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে নাইট্রোজেনের সুস্থিত অণু (N2) তৈরি করে। দুইটি নাইট্রোজেন পরমাণুর এই বন্ধন প্রকৃতির অন্যতম শক্তিশালী বন্ধন। বন্ধন শক্তি বলতে আমরা বুঝি কোন একটি রাসায়নিক বন্ধন ভাঙতে আমাদের যে পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করতে হয়। দুইটি নাইট্রোজেন পরমাণুর মধ্যকার বন্ধন ভাঙতে অন্যান্য পরমাণুর তুলনায় অনেক বেশি শক্তি (৯.৮ ইলেকট্রন ভোল্ট) লাগে।
নাইট্রোজেন পরমাণুর ভাঙন প্রাকৃতিকভাবে ২টি উপায়ে হয়ে থাকে। বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট বিদ্যুৎক্ষরণের কারণে যে তাপ উৎপন্ন হয় তাতে নাইট্রোজেন অণু ভেঙে দুইটি পৃথক নাইট্রোজেন পরমাণুর সৃষ্টি হয়। অতি সক্রিয় নাইট্রোজেন পরমাণুগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড তৈরি করে। এরা বায়ুমণ্ডলে অবস্থান করে এবং আকাশের মেঘে থাকা পানির কণার সাথে বিক্রিয়া করে ও বৃষ্টিপাতের সময় মাটিতে এসে পড়ে। এছাড়াও মাটিতে বসবাসরত কিছু ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেনের বন্ধন ভাঙতে সক্ষম। ফলে সেই ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের জন্য নাইট্রোজেন সরবরাহ করে। কিন্তু সরবরাহের হার খুবই ধীর গতির। অন্যদিকে বৃহৎ মাত্রায় নাইট্রোজেন উৎপাদনের জন্য বজ্রপাতের পরিমাণ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই রসায়নবিদরাই ছিলেন শেষ ভরসা।
১৮১১ সালে জর্জ হিল্ডারব্রাণ্ডট একটি আবদ্ধ ফ্লাস্কে হাইড্রোজেন আর নাইট্রোজেন মিশিয়ে সেখান থেকে অ্যামোনিয়া তৈরির চেষ্টা করেন। গুয়ানোতে পাওয়া নাইট্রোজেনযুক্ত যৌগের মাঝে অ্যামোনিয়া অন্যতম। সফলতার মুখ না দেখায় তিনি চাপ বৃদ্ধির জন্য ফ্লাস্কটিতে পানির ৩০০ মিটার নিচে ডুবিয়ে রাখেন। কিন্তু তাতেও কাজ হল না। তবে তিনি আসলে সঠিক পথেই ছিলেন। তার এই কর্মপ্রচেষ্টাটি পরবর্তী ১০০ বছর ধরে বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন পদ্ধতিতে গবেষণাগারে অব্যাহত রাখেন। কিন্তু সবাই ব্যর্থ হন।
১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হেবার এই এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তিনি জানতেন সম্ভবত পূর্বের ব্যর্থ বিজ্ঞানীদের কাতারে নাম লেখাতে যাচ্ছেন। তখন তিনি University of Karlsruhe তে কর্মরত নিম্ন স্তরের ৩৬ বছর বয়স্ক একজন গবেষক। তিনি প্রভাবকের (বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য শক্তির পরিমাণ কমানো বা বিক্রিয়ার হার হ্রাস অথবা বৃদ্ধিতে ব্যাবহৃত রাসায়নিক উপাদান) উপস্থিতিতে উচ্চ চাপের পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রায় নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনকে একত্রিত করার চিন্তা করেন। তবে পরীক্ষাটি চালাতে হলে নতুন যন্ত্রপাতি তৈরি করতে হবে। সেই যন্ত্রপাত্রি তৈরিতে হেবার দিনরাত পরিশ্রম করেন। তবে ভাগ্যও তার পক্ষে ছিল।
গবেষণা চলাকালে হেবার একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পরামর্শকের দায়িত্বে ছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি দুষ্প্রাপ্য অনেক উপকরণ ও উপাদানের খোঁজ পান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় অসমিয়ামের কথা। অসমিয়াম খুবই বিরল একটি ধাতু। তার সময়ে নিষ্কাশিত বিশুদ্ধ অসমিয়ামের পরিমাণ ছিল সর্বসাকুল্যে প্রায় ১০০ কিলোগ্রাম। কিন্তু কোম্পানি তাদের বাল্ব তৈরির ফিলামেন্ট হিসেবে অসমিয়াম ব্যাবহারের চিন্তা করে। ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ অসমিয়াম তাদের হাতে ছিল। হেবার অসমিয়ামকে তার পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করে।
১৯০৯ সালের মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের কোন একদিনে তিনি অসমিয়ামের একটি স্যাম্পল তার ল্যাবে আনেন। প্রেশার চেম্বারে তিনি অসমিয়ামের পাতটিকে স্থাপন করেন। এরপর তিনি চেম্বারে থাকা হাইড্রোজেন আর নাইট্রোজেনের মিশ্রণের তাপমাত্রা ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ ২০০ অ্যাটমোস্ফিয়ারে উন্নীত করেন। এই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এবং সুনির্দিষ্ট শর্তাধীনে নাইট্রোজেনের তিনটি সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে যায় এবং একটি নাইট্রোজেন পরমাণু তিনটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে অ্যামোনিয়া তৈরি করে। এভাবে মোট মিশ্রণের ৬ শতাংশ অ্যামোনিয়াতে পরিণত হয়। গ্যাস মিশ্রণকে শীতল করলে সরু টিউবের মধ্য দিয়ে প্রতি ফোঁটায় ১ মিলিলিটার অ্যামোনিয়া গ্যাস বিকারে জমা হতে থাকে। এক্সপেরিমেন্ট সফল হলে হেবার পাগলের মত এক ল্যাব থেকে আরেক ল্যাবে ছুটোছুটি করতে থাকেন। তিনি সবাইকে বলেন,”এই যে দেখো অ্যামোনিয়া”।
অ্যামোনিয়ার বন্ধন গঠন প্রক্রিয়া। Image source: ANIMATE4.COM/SCIENCE PHOTO LIBRARY
জার্মানির সবচেয়ে বড় রাসায়নিক কোম্পানি বিএএসএফ হেবারের প্রক্রিয়াটিকে বাণিজ্যিকীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। চার বছরের মধ্যে তারা Oppau শহরে অ্যামোনিয়া উৎপাদনের কারখানা গড়ে তোলে। সেখানে দিনে ৫ টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করা হত। বাতাস থেকে পাওয়া নাইট্রোজেন দিয়ে মানুষ তখন চাষ করা শুরু করে। কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত সার প্রয়োগের ফলে একই জমি থেকে কৃষকেরা আগের থেকে চারগুন বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এর ফলে পৃথিবীর জনসংখ্যাও চারগুন বেড়ে যায়। তাই আমাদের জীবনধারণে হেবারের এই উদ্ভাবনের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সাথে হেবারেরও ভাগ্য খুলে যায়। তার পদোন্নতি হয়। বার্লিনের Kaiser Wilhelm Institute of Physical Chemistry তে তাকে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়াও সমসাময়িক অনেক বিজ্ঞানীদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ম্যাক্স প্লাঙ্ক, ম্যাক্স বর্ণ, আলবার্ট আইনস্টাইন অন্যতম। এমনকি আইনস্টাইন ১৯১৪ সালে তাঁর প্রথম স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার দিন হেবারের বাসায় রাত্রিযাপন করেছিলেন। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, হেবার তো
মানব সভ্যতার অনেক বড় উপকারই করেছেন। তাহলে তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিতে সবাই নাখোশ কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পরেই জার্মান সেনাবাহিনীর গানপাউডার ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদির সঙ্কট দেখা দেয়। হেবার তখন চিন্তা করেন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে খুবই উন্নতমানের সারের পাশাপাশি একে বিস্ফোরক হিসেবেও ব্যাবহার করা সম্ভব। (এর নমুনা আমরা দেখেছি ২০২০ সালের ৪ আগস্ট। এই দিনে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের একটি গুদামঘরে রাখা ৩০০০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের সেই বীভৎস বিস্ফোরণের দৃশ্যের ভিডিও আজও আমাদের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, হেবারের পদ্ধতি ব্যাবহার করে অ্যামোনিয়া উৎপাদনের কারখানা Oppau Plantও ১৯২১ সালের এক বিস্ফোরণে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়।) এর পেছনেও রয়েছে রসায়নের কারসাজি।
নাইট্রোজেন পরমাণুর বন্ধন ভাঙ্গার সময় যেমন বিপুল পরিমাণ তাপ সরবরাহ করতে হয়, তেমনি দুইটি নাইট্রোজেন পরমাণু বন্ধনে আবদ্ধ হলে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি নির্গত হয়। গানপাউডার, টিএনটি, নাইট্রোগ্লিসারিন এবং অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে উৎপাদ হিসেবে দ্বিপরমানুক নাইট্রোজেন গ্যাস তৈরি হয়। নাইট্রোজেনের দুইটি পরমাণু তিনটি সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হওয়ার সময় যে শক্তি নির্গত হয় সেটাই বিস্ফোরণের মূল শক্তির উৎস।
হেবার তখন সার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলেন। তিনি অ্যামোনিয়া থেকে সার প্রস্তুতের পাশাপাশি বিস্ফোরক অ্যামোনিয়া নাইট্রেট তৈরিতে তাঁর আবিষ্কার করা পদ্ধতি ব্যাবহারের সুপারিশ করেন। অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রেট এবং নাইট্রেট থেকে টিএনটি তৈরির প্রক্রিয়াটি নিয়ে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু হেবার ছিলেন নাছোড়বান্দা। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর এই উদ্ভাবন জার্মানির যুদ্ধাস্ত্র এবং রণকৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
তবে হেবার এতেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যুদ্ধে রসায়নবিজ্ঞান এর চেয়েও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি একটি রাসায়নিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালান। ফলাফলে তিনি খুব একটা খুশি ছিলেন না। তিনি এমন এক ধরনের গ্যাস তৈরি করতে চাচ্ছিলেন যা সামান্য ঘনমাত্রায় প্রাণঘাতী কিন্তু বায়ুর চেয়ে ভারি। এমন গ্যাস খুব সহজেই বাতাসের উপর ভর করে খুব সহজেই শত্রুপক্ষের আস্তানায় পৌঁছে যাবে এবং নীরবে তার ধ্বংসলীলা চালাবে।
মাত্র কয়েক মাসের ব্যাবধানে পরীক্ষাগারে তিনি তার সেই কাঙ্ক্ষিত গ্যাস তৈরি করে ফেলেন। সেটি ছিল ক্লোরিন গ্যাস। ১৯১৫ সালের ২২ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬ টার দিকে জার্মান সৈন্যরা ৫০০০ গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ১৬৮ টন ক্লোরিন গ্যাস বাতাসে ছেড়ে দেয়। বাতাস সে সময়ে জার্মানির পশ্চিম সীমান্তবর্তী বেলজিয়ামের Ypres নগরীর দিকে প্রবাহিত হচ্ছিল। সেখানে ফ্রেঞ্চ উপনিবেশের সেনাদের দুইটি ডিভিশন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। ক্লোরিন গ্যাস বাতাস থেকে আড়াই গুণ ভারী। তাই এই গ্যাস সহজেই সেনাদের বাঙ্কারে প্রবেশ করে। সৈনিকেরা সেই বাতাসে শ্বাস নেয়ার সাথে সাথে তাদের ফুসফুস ক্লোরিন গ্যাসে পূর্ণ হয়ে যায় এবং তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। ক্লোরিন গ্যাস মূলত ফুসফুসের মিউকাস আবরণীর কাজকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এর ফলে তাদের ফুসফুসে তরল পদার্থ জমে যায়। হেবারের সহকর্মী অটো হ্যান এই নতুন রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন। ফলাফলের ভয়াবহতা জেনেও হেবার তাকে এই গ্যাস প্রয়োগের নির্দেশ দেন এই বলে,” অগণিত মানুষের জীবন বাঁচবে যদি এভাবে তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করা যায়”। তবে যুদ্ধ শেষ করার নেশায় তিনি মানবতা ভুলে যে নির্মম গণহত্যা চালাচ্ছেন সেটা বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলেন। সেই আক্রমণে ৫০০০ এর বেশি সৈন্য মারা যায়। এরপরে বহুবার ক্লোরিন গ্যাসের আক্রমণ চলতে থাকে এবং অগণিত তাজা প্রাণ তাতে নিরবে ঝরে পড়ে।
অনুসন্ধান পর্ব শেষে যে কেউ হেবারকে ভিলেন বা হিরো যে কোনটাই বেছে নিতে পারেন। হিরো বলার কারণ তাঁর আবিষ্কারের কারণেই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ আজ খাদ্য খেয়ে বেঁচে আছে। আবার অন্যভাবে দেখলে তিনি আসলে গল্পের মূল চরিত্র হিসেবে অপ্রাসঙ্গিক। কারণ কোন না কোন বিজ্ঞানী তাঁর নিকটতম সময়েই হয়ত ঠিকই বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহের প্রক্রিয়া আবিস্কার করে ফেলতেন। আবার হেবারের মত আরও অনেক বিজ্ঞানী রাসায়নিক অস্ত্র তৈরিতে মগ্ন ছিলেন।
গত কয়েক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জীবনব্যাবস্থাকে অকল্পনীয়ভাবে উন্নত করে তুলেছে। কিন্তু একই সাথে আমাদের নিজেদের ধ্বংস করার নিত্য নতুন উপায়ও বিজ্ঞানীরা বের করছে। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে আমাদের সকলের নিবেদন ও প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন মানবকল্যানে তাদের সকল আবিস্কার ব্যাবহার করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তথ্য একটি দুমুখো তলোয়ারের মত। কোন আবিস্কার বা গবেষণালব্ধ জ্ঞান কিভাবে বর্তমানে বা ভবিষ্যতে ব্যাবহার করা হবে তা আমরা কেউ জানি না। ঠিক যেমন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট একই সাথে রাসায়নিক সার আবার বিধ্বংসী বিস্ফোরক দ্রব্য। তাই ভবিষ্যৎ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল-কিভাবে আমরা পৃথিবী ও নিজেদের ধ্বংস ব্যাতিত প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান এবং ক্ষমতাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ।
তথ্যসুত্রঃ
১। Enriching The Earth – Smil, V. (2004). Enriching the earth: Fritz Haber, Carl Bosch, and the transformation of world food production. MIT press.
২। Mastermind: The Rise and Fall of Fritz Haber, the Nobel Laureate Who Launched the Age of Chemical Warfare, by Dan Charles
৩। Rodrigues, P., & Micael, J. (2021). The importance of guano birds to the Inca Empire and the first conservation measures implemented by humans
৪। Da Silva, G. (2020). What is ammonium nitrate, the chemical that exploded in Beirut. Sci Am, 5.
৫। https://www.history.com/this-day-in-history/germans-introduce-poison-gas
৬। Veritasium Youtube Channel
লেখক
নাসরুল্লাহ মাসুদ
প্রভাষক, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়



0 Comments