বিজ্ঞানশিক্ষাঃ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিময় আধুনিক পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে “বিজ্ঞান” নামক কাটখোট্টা শব্দটার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছি। জড়িয়ে থাকব না কেন? সবখানেই তো বিজ্ঞান! আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের প্রয়োগটা অনেক বেশি। তাই এ জিনিসের মধ্যে ঢুকে যাওয়াটাও বেশ জরুরি। কথাটার হাজারো প্রমাণ রয়েছে। যেমনঃ রোগের ভ্যাক্সিন গ্রহণ করে আমরা নিরাপদ জীবন যাপন করি। আবার বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব ব্যাগ উদ্ভাবন করেছেন। এই দুইটি ঘটনায় কোন ধরণের জ্ঞান মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল? নিশ্চয়ই প্রশ্নগুলোর উত্তর হবে “বিজ্ঞান”। আসলে প্রকৃ্তির প্রতিটি উপাদান ও ঘটনার মাঝেই বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে।

আদিকাল থেকেই মানুষ বিজ্ঞানের রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করেছে। আর যে জাতি এই দিকে যত বেশি এগিয়েছে, সে জাতি তত বেশি উন্নতি সাধন করেছে। আপনার বাড়ির টিউব লাইট কিংবা বাল্ব, বিদ্যুৎ কিংবা ডায়নামো, পেনিসিলিন কিংবা পেসমেকার-সব জায়গাতেই কম-বেশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত বিশ্বের বিজ্ঞানীদের চিহ্ন পাওয়া যায়। কারণ তারা বিজ্ঞানকে সহজে গ্রহণ করতে পেরেছে। বিজ্ঞানের প্রতি তাদের একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এবং আছে। একারণেই তারা বিশ্বের সর্বোন্নত দেশগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। বিজ্ঞানশিক্ষার সম্প্রসারণ ও স্বার্থক প্রয়োগ ছাড়া কোনো দেশ এগোতে পারে না। 


তবে দুঃখের বিষয় হলো, “বিজ্ঞান” বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট বা বিভাগ হিসেবে বিবেচিত। আমাদের দেশের মানুষজনের বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের মানুষজন অপেক্ষা বেশ দুর্বল। আর এই কারণে এদেশে বিজ্ঞানের প্রয়োগ ও প্রসার একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে। আজকের দিনে যে দেশে বিজ্ঞানশিক্ষার অবস্থা শোচনীয়, সে দেশ উন্নয়নের মাপকাঠিতে তলানিতে পড়ে যায়। তাই আমাদের উচিৎ বিজ্ঞানশিক্ষাকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা এবং বরণ করে নেওয়া। 
বাংলাদেশে মূলত তৃ্তীয় শ্রেণী থেকে বিজ্ঞান পড়ানো হয়ে থাকে এবং এর তাত্ত্বিক পাঠকে অন্যান্য সাবজেক্টের মতোই তুলে ধরা হয়। এখানেই অন্যান্য উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের সাথে আমাদের বড় একটা পার্থক্য! চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, কোরিয়া, ইসরায়েল প্রভৃতি দেশগুলোতে ভাষা, ইতিহাস, সমাজকথা ইত্যাদি বিষয়কে যেভাবে পড়ানো হয়, বিজ্ঞানকে কিন্তু সেভাবে উপস্থাপন করা হয় না। ঐসব দেশের শিক্ষার্থীরা আমাদের মতো বিরক্তিকর পদ্ধতিতে বিজ্ঞান মুখস্ত করে না। 
যারা আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে, তারা জানে যে বিদেশী শিক্ষার্থীদের কাছে “বিজ্ঞান” একটি আকর্ষণীয় বিষয়। তাদের কাছে অলিম্পিয়াড কোনো প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি উৎসব। (আমি আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে মেডেলজয়ী বাংলাদেশী ছাত্র অদ্বিতীয় দাদার মুখ থেকে এ কথা শুনেছিলাম।) আর বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীদের আছে বিজ্ঞান কঠিন বা জটিল ও অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়। একারণেই তারা বিজ্ঞানকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। 
দেখুন, আমাদের দেশে যারা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে লেখাপড়া করে, তাদের অধিকাংশই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি পেশাকে বেছে নেয়। কিন্তু উন্নত দেশের অনেক বিদ্যার্থী চিকিৎসক হয়ে পিএইচডি অর্জন করতে লেগে পড়ে। এখানে একটা বিশাল তফাৎ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আমাদেরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ তাদের লক্ষ্য অনেক বড়। একারণেই তারা দাপুটে আর উন্নত হতে পেরেছে।
আমাদের দেশের জাতীয় উন্নয়নেও কিন্তু বিজ্ঞান অবদান রাখতে পারে। এর একটি বড় প্রমাণ হলো পাটের জিনোম সিকোয়েন্স এর উদ্ভাবন। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের দ্বারা সম্পাদিত এই গবেষণার সুফল হিসেবে আজকে দেশে পাটের উন্নত ও রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ হচ্ছে। এমনকি চাষের পরিমাণ আগের থেকে  বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাত বিশেষত কৃষি খাত বেশ খানিকটা সমৃদ্ধ হয়েছে। এছাড়াও ইলেকট্রনিক্সের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এ দেশে নতুন আঙ্গিকের ভোটিং মেশিন (ইভিএম) উদ্ভাবিত হয়েছে। এই মেশিন যথাযথভাবে ব্যাবহারের ফলে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশের কাজ সহজ ও দ্রুত হয়েছে। এরকম ডজনখানেক উদাহরণ রয়েছে, যেগুলো বিজ্ঞানের আশীর্বাদে আমাদের দেশের উন্নয়নে প্রতিনিয়ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ।

চোখের সামনে বিজ্ঞানের জয়-জয়কার দেখেও এক শ্রেণীর নির্বোধেরা বলে, “এতো যত্ন করে বিজ্ঞান শিখে কী লাভ? দেশের মানুষ খেতে পারে না, আগে সেটার সমাধান করা উচিৎ, দুর্নীতি হ্রাস করা দরকার।“ কিন্তু এ কথাগুলো বলার আগে আপনাকে ভাবতে হবে যে আপনি কোন সেক্টর নিয়ে কথা বলছেন। দেখুন, মানুষের খেতে না পারাটা দারিদ্র্য সমস্যা, যেটা আর্থসামাজিক খাতের বিষয়। দুর্নীতির সমস্যা ক্রাইম সেক্টরের বিষয়। আর বিজ্ঞানশিক্ষা উদ্ভাবনী বা উন্নত শিক্ষার ব্যাপার। তাই আমাদেরকে প্রতিটা খাত বা সেক্টরকে নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে। তবে দারিদ্র্য বা দুর্নীতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা ও এগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ-এটা ভুল নয়। তাই বলে তো বিজ্ঞানকে ছুটি দেওয়া যাবে না। 
দেখুন, বিজ্ঞান এমন একটা বিষয় যার স্বার্থক প্রয়োগের ফলে অনেক জাতীয় সমস্যা দূরীভূত করা সম্ভব। বিজ্ঞানের ফলিত অংশ বা প্রায়োগিক দিককে কাজে লাগিয়েই ধান, গম, পাট, ভুট্টা ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন বৃ্দ্ধি করা সম্ভব হয়েছে যা খাদ্যাভাবের হার সফলভাবে কমাতে পেরেছে। আবার এই বিজ্ঞানের কল্যাণেই সিসি টিভি ক্যামেরা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রোটেকশন সিস্টেম এবং আরও অনেক উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এর মাঝেই অনেকগুলোই বাংলাদেশে কার্যকর। এসব ব্যবস্থাপনার প্রভাবে দুর্নীতি ও অপরাধের প্রতিরোধ ও বিচার সহজেই সম্পন্ন হচ্ছে। আমি বলতে চাচ্ছি, বিজ্ঞান দিয়ে খাদ্যাভাব বা দুর্নীতির প্রতিকার কিছুটা হলেও সম্ভব। আমি এগুলোকে নির্মূল করার হাতিয়ার হিসেবে বিজ্ঞানকে “একমাত্র উপকরণ” বলছি না, বরং বলছি যে বিজ্ঞান এধরণের সমস্যার পরিমাণ হ্রাস করতে পারে। কিন্তু আমরা বাঙালিরা বিজ্ঞানকে সেভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। 
সমস্যা হলো, আমরা আরামপ্রিয় জাতি হওয়ায় জটিলের ধারে-কাছে যেতে চাই না। তাই আমাদের মানসিক অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছে যে অনেক মজাদার বিষয়কেও আমরা কঠিন মনে করে এড়িয়ে চলি। যেমনঃ বিজ্ঞান। বিজ্ঞানকে গ্রহণ করতে হলে অধ্যাবসায়ী হতে হয়। কিন্তু সামান্য ধৈর্যটুকুও আমাদের নেই। দেশের কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ বিজ্ঞানশিক্ষায় আত্মনিয়োগ করলেও বাকিরা শুধু আরামটাকেই বড় মনে করেছে। 
আমি বিজ্ঞানের বই-পত্র পড়ে সবাইকে কোয়ান্টাম, বিবর্তন কিংবা জৈব যৌগ শিখতে বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। জোর করে বিজ্ঞান শেখার দরকার নেই। বরং বিজ্ঞানের প্রতি একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি। যদি দৃষ্টিভঙ্গির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরে যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে মূর্খতার পরিচয় দেওয়া হবে। 
অনেক ধর্মকাতর মানুষ বিজ্ঞানের নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। আমি বিজ্ঞানকে ধর্মের উপরে চাপাচ্ছি না কিংবা ধর্মের সাথে বিজ্ঞানকে মিশিয়ে দিচ্ছি না। যে যার মতো থাকুন, কিন্তু বিজ্ঞানকে সাথে নিয়ে চলুন। তাহলেই হচ্ছে! ধর্মকে বিজ্ঞান দিয়ে কিংবা বিজ্ঞানকে ধর্ম দ্বারা ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞান ভুল, অপ্রয়োজনীয় বা খারাপ কিছু। 
দেখুন, যেকোনো বিষয়ের ভেতরে ঢুকে সেটার ভালো দিকগুলো গায়ে মাখতে চাইলে সর্বপ্রথমে একটা ভালো দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। যদি দৃষ্টিভঙ্গিটাই ইতিবাচক না হয়, তাহলে সে জিনিসে কী মজা, কী কল্যাণ সেটা কোনোদিনও মাথায় ঢুকবে না। আমার মনে হয় না কোনো বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের বিজ্ঞানকে অবহেলা করা উচিৎ। কেননা, বিজ্ঞান না থাকলে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা মরণব্যাধির ভ্যাক্সিন, এক্স-রে কিংবা ইসিজি, সিটি স্ক্যান কিংবা আল্ট্রাসনোগ্রাফি-কিছুই পেতাম না। 

শুধু তা-ই নয়, একে কাজে লাগিয়েই আপনার আমার বাসার লাইট-ফ্যান কিংবা এসি,রুম হিটার ইত্যাদি চলছে। সুতরাং, “বিজ্ঞান” শুনে নাক সিঁটকানোটা রীতিমতো বোকামি, আর এই ভুলের কারণেই আমরা বিজ্ঞানশিক্ষায় পিছিয়ে আছি। তাই ধর্মপ্রচারক, রাজনীতিবীদ, পেশাজীবী কিংবা আমজনতা-যে যেই শ্রেণিরই হোক না কেন, সবাইকে মানতেই হবে, বিজ্ঞান আমাদের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। 
এবার আসি “বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি” কীভাবে আমাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করে  সে প্রসঙ্গে। একটা সহজ উদাহরণ দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ধরুন, আপনি ডায়াবেটিসের রোগী। আপনার বিশ্বাস, নিয়মিত ব্যায়াম আর হাঁটাচলা ডায়াবেটিসকে দূরে ঠেলে দেয়। মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে এর নেতিবাচক প্রভাব সুদে-আসলে আপনি টের পাবেন। তো, আপনার বুদ্ধি-বিবেক যদি ঠিকঠাক থাকে, তাহলে আপনি শরীরচর্চার অভ্যাস গঠনের জন্য উদ্যত হবেন এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার পরিমাণমতো গ্রহণ করবেন। আর যদি বলেন, “আমি ডায়াবেটিসের চেয়েও শক্তিশালী”, তাহলে বিনা বাধায় ডায়াবেটিসকে জীবনসঙ্গী বানাচ্ছেন। যা কিনা আপনার মৃত্যুর আগে আপনার মতো বন্ধুকে বিদায় জানাবে না।
তো, বিজ্ঞানটাও এমন বিষয়। এখানে ডায়াবেটিস হলো আমাদের অবনতি, দুর্বলতা আর বিচক্ষণতার অভাব। আর শরীরচর্চা হলো বিজ্ঞানের মতো। বিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখানর চেষ্টা করলে আপনি তো গর্তে পড়বেনই। সেই সাথে জাতিও ইঞ্জিন ছাড়া হয়ে পড়বে। পাঠক বন্ধুরা, বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান নিয়ে একটা যুক্তি দিলাম, এবার বাস্তব উদাহরণের দিকে যাওয়া যাক। 

আমি আগেও বলেছি আর আমরা সবাই নিজেদের চোখে দেখছি যে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বিজ্ঞানশিক্ষা অর্জন ও প্রয়োগে সর্বাধিক অগ্রসর। কিন্তু আমরা অনেক কিছুতে উন্নতি করলেও বিজ্ঞানের মর্যাদা বুঝতে না পারায় টেকসই উন্নয়নের ম্যারাথনে বেশ পিছিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, উন্নত দেশ ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এখানে তফাৎ কোথায়? এই প্রশ্নটার উত্তর আমি তিন ভাগে দেবো।
প্রথমেই বলব শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকগণের কথা। কোনো বিদেশী শিক্ষার্থীর সাথে আমার সরাসরি আলোচনা না হলেও ভার্চুয়ালি যোগাযোগ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। সৌভাগ্য এজন্য বললাম যে তাদের মাধ্যমে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি। প্রথমত তারা বিজ্ঞান সম্পর্কে কৌতুহলপ্রবণ। তাদের অনেক স্কুলগুলোতেই প্রতি মাসে সাইন্স ফেস্টিভ্যাল বা প্রজেক্ট ফেয়ারের আয়োজন করা হয়। সেখানে তারা নিজেদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে নতুন ভাবনা ও কৌশল উপস্থাপন করে। আর আমাদের দেশের প্রজেক্ট গুলোকে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের যুদ্ধটা হয় জয়ের লক্ষ্যে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে না। আমাদের শিক্ষার্থীরাও তাই দুর্বল প্রকল্প উপস্থাপন করে। 
আমার মনে হয় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে দু’টি বিষয়ে পিছিয়ে। প্রথমত, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বিতীয়ত, ভুল উপায়ে চিন্তা করা। প্রতিযোগিতার কথা চিন্তা করে কাজ করলে শিক্ষার্থীদের ভাবনাগুলো অনেক ক্ষুদ্র হয়ে যায়। তারা নিজেদেরকে একটা সীমানার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। আর তারা চিন্তাও করে জটিল উপায়ে। কিন্তু প্রকল্পের ওজন হয় খুবই হালকা। আমি ফরেইন কান্ট্রির বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট দেখেছি। কিছু কিছু কাজ দেখে আমি আফসোস করেছি যে এইটুকু বাচ্চারা কত সহজভাবে ভেবেছে। কিন্তু আমি নিজেই তাদের মতো চিন্তা করতে পারিনি। যতদূর আমি বুঝলাম, ওরা অল্প ও সহজ কথা ও কাজের মাধ্যমে বিশাল বিষয়কে উপস্থাপন করতে পারে। কারণ বিজ্ঞানকে ওরা হৃদয়ে বসাতে পেরেছে।
আমার এক কাজিন ছোট থাকতেই লেখাপড়ার জন্য সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিল। তার বর্তমান চিন্তা-ভাবনা আর কাজ-কর্ম দেখে মনে হয় না সে বাঙালি। তাকে দিয়েই সংক্ষেপে বিদেশী শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা করব। 

বিজ্ঞানের প্রতি তার এবং তার বন্ধুদের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন। “বিজ্ঞান” জিনিসটা তাদের কাছে নিত্য দিনের কাজের মতোই সহজ আর গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাপার। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখাপড়া করা আমার ঐ ভাই কম্পিউটার সায়েন্সে বেশ দক্ষ। সে কিন্তু ঠুস করে এক্সপার্ট হয়ে যায়নি। বিজ্ঞানকে সে শুরু থেকেই উপলব্ধি করেছে ও বুঝতে শিখেছে। সে বিশ্বাস করে যে বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অসাধারণ কিছু করা সম্ভব। এই খাঁটি দৃষ্টিভঙ্গি, ভাবনা আর জ্ঞান থাকার কারণে একবার সে অসাধারণ কিছু করে দেখিয়েছিল। 
আমার ঐ ভাই যখন স্কুলে পড়তো, তখন একদিন তার টিচারের কম্পিউটার সিস্টেমে ভূত ভর করেছিল। সে নিজেই ঐ সফটওয়্যার প্রব্লেম সমাধান করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এই দক্ষতা সে রাতারাতি অর্জন করে ফেলেনি। বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে মূল ভূমিকা পালন করেছিল। 
আপনি খবর নিয়ে দেখুন, ঐসব দেশের বহু শিক্ষার্থী ফ্রী টাইমে বিজ্ঞানের ওপর স্পেশ্যাল ক্লাস বা কোর্স করে কিংবা নিজেকে সায়েন্স ক্লাব বা প্রজেক্টের সাথে যুক্ত রাখে। আর আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা তো সেভাবে ফ্রী টাইমই পায় না, আর পেলেও তাদের সময় কাটে ফ্রী ফায়ার-পাবজি, ফেসবুক-ইন্সটা কিংবা সিরিয়াল-সিরিজে। এটাই তফাৎ, এই তফাতের পেছনে দৃষ্টিভঙ্গিই দায়ী। 
আরেকটা বড় পার্থক্যের কথা এই প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছিলাম। সেটা হলো, বাঙালি শিক্ষার্থীরা ভাবে বিজ্ঞান পড়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অভাবমুক্ত জীবনযাপন করলেই সফল! আর উন্নত দেশের বহু শিক্ষার্থী পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর এমন স্বপ্নদ্রষ্টার সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়! এই যে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে এর পেছনে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়ন, সুনিশ্চিত ক্ষুদ্র ভবিষ্যতের পেছনে দৌঁড়ানো যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী অভিভাবকেরা। 
অভিভাবকেরা চায় তাদের সন্তান অল্প কষ্টেই যেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অভাবমুক্ত জীবন যাপন করতে পারে। একারণে তারা ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের কানে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার তিক্তরস ঢেলে দেন। এর ফলে ছেলে-মেয়েগুলো তাদের মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা-ছেলে দু’জনেই গবেষক। কারণ উভয়েরই দৃষ্টিভঙ্গি উচ্চ পর্যায়ের। আজ অনুন্নত, নেতিবাচক ও ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা এভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে তাদের মেধাশক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটছেনা। 
 

শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকগণের পরে সাধারণ জনগণকে নিয়েও কিছু কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশের নাগরিকগুলো নামেই নাগরিক। মানে এদেশে সুনাগরিক খুবই কম। অধিকাংশেরই চিন্তা থাকে নিজে খেয়ে বাঁচলেই হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাচ্ছি-এটাই যথেষ্ট। যতটুকু জানি তা দিয়েই চলবে। এ যুগে এসে কোনো মানুষ যতই ডিগ্রীধারী হোক না কেন, সাধারণ বিজ্ঞান না জানলে বা না শিখলে তাকে প্রকৃ্ত শিক্ষিতের কাতারে দাঁড় করানো যাবে না। এবার আপনিই বলিন, দেশে কতজন মানুষ প্রকৃ্ত শিক্ষিত? 
সাধারন জনগণের বিজ্ঞানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বড়ই দুর্বল হওয়ায় লোকসমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে যে দুধ আর আনারস একসাথে খেলে বা দুধ পান করার পরে আনারস খেলে মানুষ নাকি শয্যাশায়ী হয়ে যায়। অনেকের ধারণা এতে নাকি মানুষের মৃত্যুও হতে পারে! এটাই তো সমস্যা। আপনি উন্নত দেশের সচেতন নাগরিকদের সাথে কথা বলে দেখুন, তারা বিজ্ঞানসম্মত ও পরীক্ষিত কোনো বিষয় ছাড়া অন্যকিছুকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সেকারণে ঐ সমাজে ভুল-ভ্রান্তি বা কুসংস্কার খুব কম।
শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের ভুলের কথাও বলেছি, আবার জনগণকেও দোষারোপ করেছি। কিন্তু আমি যদি কর্তৃপক্ষের কথা না বলি, তাহলে অনেক বড় ভুল হবে। শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি তখনি ইতিবাচক হবে, সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা তখনি বাড়বে, যখন কর্তৃপক্ষ সক্রিয় হয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এখানে আমি কর্তৃপক্ষ বলতে ঐসব মানুষদের কথা বলছি যারা সরকারি অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অধিদপ্তরের সাথে যুক্ত থেকে বিজ্ঞানশিক্ষা নিয়ে কাজ করে। সেই কাজ সরাসরি জনগণ ও শিক্ষার্থীদেরকে প্রভাবিত করে। গত কয়েক বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের ভালো দিকও যেমন চোখে পড়েছে, তেমনি দুর্বলতাও ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় শিক্ষক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষা অধিদপ্তর, অলিম্পিয়াড কমিটি ও জাতীয় পর্যায়ের বিজ্ঞান সংগঠনগুলো যে ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে, সেগুলোকে অগ্রাহ্য করা যায় না। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর সাথে তুলনা করি, তখন? আমাদের সরকারি কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞানকে নিয়ে যেভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তাতে সেগুলোকে রণক্ষেত্র বলা যেতেই পারে। এখানে আমি সব সংগঠন বা সব প্রতিযোগিতার বা ক্যাম্পেইনের কথা বলিনি। তবে অধিকাংশই এমন।
আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে বিজ্ঞান পড়ানো হয় সেটা তো পুরোই ঘুণে ধরা। বিজ্ঞান কি না বুঝে মুখস্ত করার জিনিস? শিক্ষার্থীরা এই মুখস্থবিদ্যার কারণে বই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বইতে সে যে গাছের বিবরণ পড়েছে, বাড়ির আশেপাশে সে গাছ থাকলেও সে তা চিনতে পারেনা। কেন? কারণ আমাদের সরকারি কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদেরকে বিজ্ঞান গেলাচ্ছে। কিন্তু বোঝাতে চাচ্ছেনা।নিউটনের সূত্র জানা মানেই বিজ্ঞান বোঝা না। যে বিজ্ঞান বুঝতে পারে, সে কখনোই পুরোনো-সংগৃহীত প্রজেক্ট উপস্থাপন করেনা। আমাদের প্রজেক্ট ফেয়ারগুলোতে শিক্ষার্থীরা অভিনব চিন্তা দিয়ে কোনো প্রকল্প সেভাবে উপস্থাপন করতে পারেনা। এর একটি কারণ হলো আমাদের পাঠ্যবইগুলো তাদেরকে বিজ্ঞান বোঝাতে পারেনি।
আর বেসরকারি উদ্যোগে সংঘটিত প্রতিযোগিতাগুলোর অধিকাংশই তাত্ত্বিক বিজ্ঞানভিত্তিক। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও একই ধাঁচের। প্রায়োগিক বিজ্ঞানকে গুরুত্ব না দিলে উচ্চতর বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি হবেনা। আর এর ফলে বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে সমাদৃত করাটাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আপনি কি জানেন, জাপানের শিক্ষার্থীরা প্রায়োগিক বিজ্ঞানে কতটা অভ্যস্ত? ওরা শৈশবেই রোবটিক্সের জ্ঞান পায় এবং রোবট নিয়ে কাজ করে। আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে প্রায়োগিক বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় করানো হোক। সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করা হোক। আমাদের শিক্ষার্থীরা কয়টি এক্সপেরিমেন্ট হাতে- কলমে করে? দুঃখের বিষয় হল আমাদের কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে নিচ পর্যন্ত প্রত্যেকেই এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্সকে অবহেলা করে। এখানেই আমরা ধরা খাচ্ছি। 

এতক্ষণ অনেক ভুল-ত্রুটির কথা বলেছি। কিন্তু সমাধানের কথাও বলা উচিৎ। কর্তৃপক্ষকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এরপর তাদেরকে দুটো সমস্যার সমাধান করতে হবেঃ দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনুপযুক্ত পদ্ধতি। তাহলেই শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের মুক্তচর্চার সাথে যুক্ত হতে পারবে। আর এর সাথে প্রয়োজন অভিভাবকের সহযোগিতা। যদি কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক – এই তিন শক্তি একসাথে উজ্জীবিত হতে পারে, তাহলে সাধারণ জনগণও বিজ্ঞানের জোয়ারে ভাসতে পারবে।
তবে বর্তমানে আমরা বিজ্ঞান শিক্ষায় যেভাবে পিছিয়ে আছি, যেভাবে মাইনাস পয়েন্টে চলে গিয়েছি, তাতে সমধানের পথ খুব সোজা হবে না। সে ব্যাপারে না হয় অন্য কোনো দিন গল্প করব। আপাতত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অনুরোধ করব।যাতে করে সমাধানের যুদ্ধে আমরা সৈনিক হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে পারি। আর এর মাধ্যমেই আমাদের শোচনীয় পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে । 

লেখক
তাহসিন আলম উৎস 

Post a Comment

0 Comments