চলতি বিশ্বকাপে কেন এত অফসাইড বিড়ম্বনা ?

বিশ্বকাপ ফুটবল বরাবরের মতোই নিয়ে আসে একগাদা আলোচনা ও সমালোচনা। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় থাকে টপ ট্রেন্ডিং হয়ে। এবারের বিশ্বকাপেও এর ব্যত্যয় ঘটে নি। তবে এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের নিয়ে যতটা না আলোচনা হচ্ছে প্রযুক্তি নিয়ে তার চেয়ে কম কোন আলোচনা হচ্ছে না। বিশ্বকাপে প্রযুক্তির দেখা আমরা আগের বিশ্বকাপগুলোতেও পেয়েছি। এবারেরটাতেও সে সবের দেখা তো মিলেছে সাথে আরো যুক্ত হয়েছে অ্যাপস ও সেমি অটোমেটেড অফসাইড নামক এক অদ্ভুত প্রযুক্তি! এবারের লেখায় থাকবে এই অফসাইড গোলকধাঁধা   নিয়েই সংক্ষিপ্ত আলোচনা।


২০১৮ বিশ্বকাপের কথা বিভিন্ন কারণে অনেকেরই মনে থাকার কথা । তবে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয় কিংবা ক্রোয়েশিয়ার মতো আলোচনার বাইরে থাকা এক দলের রানার্স আপ হ
ওয়ার খবরকেও ছাপিয়ে দর্শকদের মনে ভেসে ওঠে একই রাতে দুই ধ্রুবতারা অর্থাৎ মেসি এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দলের পরাজয়ের নির্মম দৃশ্য। মেসিরা তৈরি হয়েই এসেছিলেন কিন্তু নকআউটে এম বাপ্পে নামের এক ঝড় এসে সব কিছু তছনছ করে দিয়েছিল সে সময়।

 তবে এবারের ব্যাপারটা ভিন্ন। প্রযুক্তির কাছেই ধরাশায়ী হয়েছে এবার মেসির দল। সৌদির সাথে খেলা ম্যাচটি যেখানে ৪-২ ব্যবধানে জেতার কথা সেখানে ২-১ ব্যবধানে পরাজয় মেসির জীবনের অপ্রাপ্তির খাতায় আরো একটি পালক যুক্ত করবে কোন সন্দেহ নেই। আর্জেন্টিনা তাদের প্রথম ম্যাচেই অফসাইড করেছে ১০টি। একই ঘটনা ঘটেছে তিউনিশিয়া, ডেনমার্কের মতো আরো অনেকের সাথে। কিন্তু প্রশ্ন বারবারই উঠছে যে, কেন এত অফসাইডের ফাঁদ এ বিশ্বকাপে? এটা কি খেলোয়াড়দের ভুল? নাকি প্রযুক্তির উন্নতি?

প্রযুক্তির কথা বলতে গিয়ে হরেক রকম প্রযুক্তির কথাই মাথায় আসার কথা পাঠকদের। তবে টপ ট্রেন্ডিংটাই এখন সবার কাছে মূখ্য। আর সেটা হলো সেমি অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। যার কারণে গোল করেও গোল বঞ্চিত খেলোয়াড়রা। যার কারণে ম্যাচ শেষে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বাড়ি ফিরে হাজারো দর্শকরা। কেউ গ্যালারি থেকে আবার কেউবা টিভি স্ক্রিন বা বড় পর্দা থেকে। ফিফা পূর্বেই জানিয়েছিল, বিশ্বকাপে রেফারির দিকে আঙুল তোলার সুযোগ কম করে দিতে চান। আর সেজন্য এত অভিনব প্রযুক্তিসমূহের সংযোজন।

কিভাবে কাজ করে অফসাইড প্রযুক্তি :

সেমি অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। একে ভিআর প্রযুক্তির নতুন সংযোজনও বলা যেতে পারে। ২০২১ সালের ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ ও আরব কাপের মতো মঞ্চে ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার হয়ে গেছে এ প্রযুক্তির। তাই মূল বিশ্বকাপে এ প্রযুক্তির পদচারণাকে নতুনই বলা যায়। এটি এতটা গুরুত্বপূর্ণ এক ধরণের প্রযুক্তি যে, এটি ব্যবহারের জন্য প্রতটিি মাঠে ১২টি করে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। যা প্রতি মুহুর্তে বল ট্র্যাক করতে সাহায্য করে। শুধুমাত্র তাই নয় খেলোয়াড়ের দেহের ২৯টি পয়েন্ট ট্র্যাক করে তার মাধ্যমে খেলোয়াড়ের অবস্থান ও দৈহিক অঙ্গ ভঙ্গিও রেকর্ড করে থাকে এ প্রযুক্তি। বাদ যায় না কনুই, হাতের কব্জি কিংবা দেহের কোন অংশ। আর এজন্যই হয়তো হাতের কব্জি অফসাইডের সীমার বাইরে বের হয়ে থাকলেও সেটা চোখ এড়ায় না রেফারির। এবারের বিশ্বকাপের বলের নাম আল রিহলা। যার মধ্যে লাগানো আছে অত্যাধুনিক সেন্সর। যার নাম ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ)। এটি প্রতি সেকেন্ড ৫০০ বার পর্যন্ত কিক পয়েন্ট ও অবস্থানের ডাটা রেকর্ড করতে পারে।


অফসাইড সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মাঠের বিভিন্ন স্থানে থাকা ১২ টি ক্যামেরার সবগুলোর অপটিক্যাল ট্র্যাকিং
, লিম্ব ট্র্যাকিং ও কানেক্টেড বলের (বল ও বলের ধ্যে থাকা সেন্সর) রেকর্ড করা এসব তথ্য পাঠানো হয় ভিডিও অপারেশন রুমে। পূর্ব থেকেই অফসাইডের তথ্য ও ছবি ইনপুট দিয়ে রাখা হয় অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। যার কারণে অফসাইড হবার মতো ঘটনা ঘটলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদমের সাহায্যে সর্বাগ্রেই সেটা জানা যায়। অর্থাৎ অফসাইড হলো কি হলো না তা এই অ্যালগরিদমই ঠিক করে দেয়। পরবর্তীতে সেসব তথ্য ম্যাচ রেফারি স্ক্রিনে দেখে নেন। এরপর এসে নিজে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। যেহেতু এখানে শেষমুহুর্তে এসে হলেও মানুষের হস্তক্ষেপে কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে অর্থাৎ  সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হচ্ছে না এজন্য একে সেমি অটোমেটেড বা আধা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বলেই অভিহিত করা হচ্ছে। আর অফসাইড অ্যালগরিদম কর্তৃক নির্ণীত হবার পরে সেটা কয়েক মুহূর্তেই ভিডিও অপারেশন রুমে চলে যায়। সেখান থেকে একটি থ্রিডি অ্যানিমেশন চিত্র তৈরি হয়। যার মাধ্যমে রেফারি, খেলোয়াড় কিংবা দর্শক যে কেউ নিশ্চিত হতে পারে। এভাবেই কাজ করে এ প্রযুক্তি।

বিহাইন্ড দ্য সিন :

অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তির পেছনে টেকনিক্যাল পার্টনার হিসেবে ফিফার পাশাপাশি যুক্ত আছে বিশ্বের অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা গবেষকরা। তাছাড়াও এ প্রযুক্তিরর জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বৈধতা ও কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস ল্যাব নির্ধারণ করেছে। লিম্ব ট্র্যাকিং প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করে দেখেছে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির ট্র্যাক নামের অস্ট্রেলিয়ান গবেষণা দলটি। তাছাড়া মাল্টিক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের পেছনে অবদান রয়েছে সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের গবেষণা দলের।

কেন লাইন্সম্যান সঙ্গে সঙ্গে পতাকা তুলছেন না?

অফসাইড প্রযুক্তির ব্যাপারে একটা সুরাহা না হয় হলো কিন্তু খেলার মাঠে দেখা যাচ্ছে যে, অফসাইড হিসেবে ধর্তব্য হবার পর পরই লাইন্সম্যান পতাকা না তুলে তা নিয়ে দৌড়াতে থাকছেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। এটা কেন? ফিফা এ নিয়ে বলেছে, আগে থেকে পতাকা তুললে অনেক গোলমুখী আক্রমণ থেমে যেত। তারা (ফিফা) সেটা চাইছেন না। অর্থাৎ এখন থেকে গোল করার আগ পর্যন্ত স্ট্রাইকার বুঝতেই পারবেন না যে তিনি অফসাইডে ছিলেন কিনা।

একদম শেষভাগে চলে এসেছি। বড়মঞ্চে শক্তির চেয়ে বুদ্ধির পরীক্ষা হয় বেশি। সেটা ফুটবলই হোক কিংবা অলিম্পিয়াডের মঞ্চই হোক না কেন। কাজেই সেক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিকতা বিচার করে নিজের বুদ্ধি দিয়ে কাজ করার শিক্ষা ফুটবলের মাধ্যমে খেলোয়াড়েরা এমনিতেই অর্জন করে থাকে। তারপরও ভিআর, সেমি অটোমেটেড অফসাইডের মতো প্রযুক্তিরা সামনের দিনগুলোতে খেলোয়াড়দের আরো কৌশলী হতে শেখাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এভাবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে আমরা আমাদের নিজেদের উৎকর্ষতাই বাড়িয়ে নিতে পারবো এর মাধ্যমে। কি বলেন সবাই?

লেখক 

রহমতুল্লাহ আল আরাবী

তথ্যসূত্র :

  1. https://www.tbsnews.net/bangla/%E0%A6%96%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BE/%E0%A6%AB%E0%A7%81%E0%A6%9F%E0%A6%AC%E0%A6%B2-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AA-%E0%A7%A8%E0%A7%A6%E0%A7%A8%E0%A7%A8/news-details-121002
  2. https://www.bigganchinta.com/technology/kof2m3sxkt
  3. https://www.fifa.com/technical/media-releases/semi-automated-offside-technology-to-be-used-at-fifa-world-cup-2022-tm 

Post a Comment

0 Comments