শেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের সূর্য

সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানের দুনিয়াতে কান পাতলে একটি প্রশ্ন শোনা যায়। প্রশ্নটি হলো, “প্রতি মুহূর্তে নাকি সূর্য তার ভর হারাচ্ছে? কীভাবে ঘটছে এই আশ্চর্য ঘটনা? আর এর ফলে কি গ্রহদের ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে না?” আজকে এই বিষয়টি নিয়েই আমি আপনাদের সামনে কিছু কথা বলব।

প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, “প্রতি মুহূর্তে নাকি সূর্য তার ভর হারাচ্ছে?” হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন। প্রতি মুহূর্তে সত্যিই কমছে সূর্যের ভর। তাও অল্পস্বল্প করে নয়। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫৮ লাখ টন পদার্থ।


চিত্র: আমাদের সূর্য

দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, “কীভাবে ঘটছে এই আশ্চর্য ঘটনা?” আসলে সূর্য ভর হারাচ্ছে মূলত দুটি উপায়ে। প্রথমটি হলো ফিউশন। আমরা জানি, পৃথিবীতে বসে আমরা যে আলো ও তাপ পাই তা আসে সূর্য থেকে। সূর্যে আছে প্রায় ৭৩% হাইড্রোজেন ও ২৫% হিলিয়াম। এই হাইড্রোজেন ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অনবরত হিলিয়ামে পরিণত হচ্ছে। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমেই তৈরি হয় আলো। পাশাপাশি অবশ্য নির্গত হয় কিছু নিউট্রিনোও। এছাড়া হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াসের পাশাপাশি তৈরি হয় দুটি প্রোটন। প্রতিবার হিলিয়াম তৈরির সময় একটি করে নতুন হাইড্রোজেনও তৈরি হয়, যা বিক্রিয়াটিকে অবিরত চালিয়ে নেয়। প্রতি মুহূর্তে সূর্য কী পরিমাণ ভর হারাচ্ছে, তা আমরা সূর্যের দীপ্তি (Luminosity) থেকে সহজেই বের করতে পারি। একটি নক্ষত্র প্রতি একক সময়ে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করে, তাকেই বলা হয় এর দীপ্তি। হিসাবটি করার জন্য আমাদের কাজে আসবে আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত সূত্রটি; E=mc²। সূত্রটি বলছে, ভর ও শক্তি আসলে একই জিনিসের ভিন্নরূপ মাত্র। এখানে E হলো শক্তি, m বস্তুর ভর এবং c আলোর বেগ। যদিও সূর্য তাপ ও আলো আকারে শক্তি নির্গত করছে, সেই শক্তির উৎস কিন্তু পদার্থই। ফলে শক্তি নির্গত করা মানেই আসলে ভর হারানো।
তাহলে দেখা যাক, সূর্য এভাবে ঠিক কী পরিমাণ ভর হারাচ্ছে। সূর্যের দীপ্তি হলো প্রতি সেকেন্ডে 3.82×10²⁶ জুল (৩৮২-এর পর ২৪টি শূন্য)। অন্য কথায় বলা যায়, সূর্যের ক্ষমতা হলো 3.82×10²⁶ ওয়াট। আবার আলোর বেগ সেকেন্ডে 3×10⁸ মিটার। অতএব, প্রতি সেকেন্ডে কী পরিমাণ ভর (m) খরচ হয়, সেটা জানতে হলে আমাদের প্রথম সংখ্যাটিকে দ্বিতীয় সংখ্যা দিয়ে ভাগ দিতে হবে। ভাগ করে আমরা পাই; 4.289×10⁹ কেজি, যা প্রায় ৪৩ লাখ টনের সমপরিমাণ!
এক বছরে সূর্য থেকে হারিয়ে যাওয়া ভরের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টন। নিশ্চয়ই ভাবছেন, এভাবে ভর হারাতে থাকলে অচিরেই সূর্যের সমস্ত পদার্থ শেষ হয়ে যাবে। না, কাজটি অত সহজ নয়। সূর্যের মোট ভর হলো 2×10³⁰ কেজি। আমাদের সৌরজগতের মোট ভরের প্রায় ৯৯.৮৬% ভাগই সূর্যের দখলে। সূর্য যদি আজীবন ভর হারাতে থাকে, তবু এর সবটুকু ভর ফুরিয়ে যেতে সময় লাগবে প্রায় ১৫ লাখ কোটি বছর। বাস্তবতা হলো, তার অনেক আগেই সূর্যের ফিউশন বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে সূর্যের যাবতীয় হাইড্রোজেন জ্বালানি।
তবে সূর্য কিন্তু আরেকটি উপায়েও ভর হারাচ্ছে; এটি হলো সৌরঝড়। সূর্যের পৃষ্ঠ প্রচণ্ড উত্তপ্ত। কেন্দ্রের তুলনায় পৃষ্ঠের তাপমাত্রা অনেক কম হলেও এই কম তাপমাত্রাই হলো ৫৫০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় ইলেকট্রন ও প্রোটনরা স্থির থাকতে পারে না। আয়নিত কণা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। এটিই হলো সৌরঝড়। এই সৌরঝড়ের প্রভাব যখন পৃথিবীর বহিঃস্থ বায়ুমণ্ডলে পৌঁছায়, তখনই তৈরি হয় সোলার অরোরা। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর আকাশে আমরা নীল আলোর যে নাচন দেখি, তা এই অরোরারই কাজ।


চিত্র: সোলার আরোরা বা সৌর ঝড়

সৌরঝড়ের মাধ্যমে সব সময় অবশ্য সমান পরিমাণ পদার্থ নির্গত হয় না। তবে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে পাওয়া পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, সূর্য প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ১৫ লাখ টন পদার্থ হারিয়ে ফেলছে। দুটো যোগ করে আমরা বলতে পারি, সূর্য প্রতি সেকেন্ডে পদার্থ হারাচ্ছে প্রায় ৫৮ লাখ টন। তার মানে, প্রতিবছর ১৭৪ ট্রিলিয়ন টন। অনেক বেশি মনে হচ্ছে, তাই না? আগেই কিন্তু আমরা ইঙ্গিত পেয়েছি, এটুকু পদার্থও সূর্যের মোট ভরের তুলনায় কিছুই নয়। আসলে ৫০০ কোটি বছর পর সূর্য যখন ভর হারানো বন্ধ করবে, তখন পর্যন্ত এর মাত্র ০.০৩৪% ভর শেষ হবে। বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির ভর সূর্যের এক হাজার ভাগের এক ভাগ। সে সময় পর্যন্ত সূর্য বৃহস্পতির ০.০৮% ভর শেষ করতে সক্ষম হবে, যা প্রায় পৃথিবীর ভরের সমান।
আমাদের শেষ প্রশ্নটি হলো, সূর্যের এই ভর হারানোর ফলে কি গ্রহদের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে? সূর্যের আকর্ষণেই তো গ্রহরা এর চারদিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। উত্তর হলো; হ্যাঁ, এর ফলে পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথে কিছু প্রভাব অবশ্যই পড়ছে। ভর হারানোর ফলে গ্রহদের ওপর মহাকর্ষের টান কমছে। ফলে পৃথিবী সত্যিই সূর্য থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রতিবছর দূরত্ব বাড়ছে ১.৬ সেন্টিমিটার করে। এভাবে সরতে থাকলে ৫০০ কোটি বছর পরে পৃথিবী সূর্য থেকে প্রায় ৭ হাজার মাইল দূরে সরবে। এটা এমন কিছু নয়, তাই আপাতত ভয়েরও কিছু নেই।

লেখক:
সাবিদ উদ্দিন নাহিয়ান 
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিজ্ঞানমনা

তথ্যসূত্র: সোলার ডট কম




Post a Comment

0 Comments