মাধ্যাকর্ষণকে তিন ভাবে ব্যাখ্যা

স্কুল জীবনে আমরা যে মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব শিখেছি সেটা ছিল নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব। সেখানে আমরা একটা গল্প শুনেছি। গল্পটা এরকম- একদিন নিউটন একটি আপেল গাছের নিচে বসেছিল। তখন তার মাথায় একটি আপেল পড়ে, নিউটন সেই আপেল পড়ার ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করে মহাকর্ষ তত্ত্ব আবিষ্কার করেন।  আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব বলতে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বকেই চিনে। কিন্তু বস্তুর আকর্ষণ ধর্ম ব্যাখ্যা করার জন্য আরো দুটি মহাকর্ষ তত্ত্ব প্রচলিত আছে। চলুন এবার জেনে নিই এই তিন প্রকার মহাকর্ষ তত্ত্ব সম্পর্কে।

দুটি বস্তুর পরস্পর আকর্ষণ করার ধর্মকে ব্যাখ্যা করার জন্য সেই তিনটি তত্ত্ব হলো- নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম গ্রাভিটি।

নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব

নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের সূত্র হলো- 

মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরের দিকে আকর্ষণ করে এবং এই আকর্ষণ বলের মান বস্তুকণাদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং এদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক। এই বল বস্তুকণাদ্বয়ের কেন্দ্র সংযোগ সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।

চিত্র: নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র

অর্থাৎ দুটি বস্তু যথাক্রমে m1 ও m2 এবং এদের মধ্যবর্তী দূরত্ব d হলে এদের মহাকর্ষ বল,

F = G (m1× m2)÷d² .............................(i)

নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বটি এরকমই ছিলো। 

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব দিয়ে মাধ্যাকর্ষণকে ব্যাখ্যা

আমরা জানি আমাদের জগৎ ত্রিমাত্রিক জগৎ। কোনো বস্তুর অবস্থান আকার-আকৃতি জানতে তিনটি মাত্রা প্রয়োজন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা)। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের জগৎ হলো চতুর্মাত্রিক আর সময় হলো সেই চতুর্থ মাত্রা। তাই কোনো বস্তুর আকৃতি ও অবস্থা পরিবর্তন করলে স্থানের সাথে সময়ের পরিবর্তন হয়, যাকে স্থান-কালের পরিবর্তন বলা হয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের মহাবিশ্বের সব জায়গায় স্থান-কালের চাদর (space-time shit) রয়েছে।

কোনো ভরযুক্ত বস্তু সেই চাদরে স্থান দখল করে। এভাবে স্থানকালের চাদর বেকিয়ে যায়, অর্থাৎ স্থানও বেকিয়ে যায়। স্থান বাঁকানোর ফলে সেই ভারী বস্তুর কাছে অন্য বস্তু আসতে থাকে। এই ঘটনাটিই হলে মাধ্যাকর্ষণ। নিচে স্থানকালের চাদরের একটি ছবি (চিত্র ১) দেখুন।

চিত্র ১ : স্থানকালের চাদর

নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতেই আপেক্ষিক তত্ত্বের স্থান কালের ব্যাখ্যা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে এই স্থান-কালের চাদরের ব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এই আপেক্ষিক তত্ত্বেরই আরেকটি মহাকর্ষীয় মডেল বের হয় যা ‘চিত্র ২’-এর মতো।


চিত্র ২ : স্থানকালের চাদর (আপেক্ষিক তত্ত্বের আরেকটি মহাকর্ষীয় মডেল) 
তবে দুটি মডেলের ভিত্তি আপেক্ষিক তত্ত্ব। আপেক্ষিক তত্ত্বের মতে ভর স্থানকে সংকুচিত করে আর সে কারণে স্থান বেকিয়ে যায় ফলে অন্য বস্তু কাছে আসে। এই ঘটনাটিই হলো মাধ্যাকর্ষণ।

কোয়ান্টাম গ্রাভিটি
চিত্র ৩ : ক্যাপশন
নাম শুনেই বুঝতে পারছেন এর ভিত্তি হবে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কোয়ান্টাম গ্রাভিটি অতটা সফল তত্ত্ব নয় যতটা নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ ও আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অর্জন করেছে। তবে এর অনেক গাণিতিক যুক্তি আছে। বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্ব থেকে অনেক কিছু আশা করেন।

কেন কোয়ান্টাম গ্রাভিটির দরকার ছিল?
নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব মহাজাগতিক বড় বড় বস্তুর (যেমন- চাদ, পৃথিবী, সূর্য ইত্যাদি) মাধ্যাকর্ষণ ভালোমতো ব্যাখ্যা করতে পারে। আবার আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব মহাজাগতিক বস্তুর স্থান-কালের ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ও আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব উভয়েই কোয়ান্টাম জগতের (অনু-পরমাণুর জগৎ) অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করতে পারেনা। যেমন- বিগ ব্যাং-এর সময় এবং ব্ল্যাকহোল-এ সকল ভর একত্রিত ছিল। এরা খুব ক্ষুদ্রভাবে একত্রিত ছিল। সেই সময়টাকে বলা হয় মহান একীভবন যুগ। নিচের ছবিটি (চিত্র ৪) লক্ষ্য করুন। এখানে যে অংশটির নাম CMB সেই অংশটি লক্ষ্য করুন। এখন যত সব গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ইত্যাদি পদার্থ স্বতন্ত্রভাবে আছে তা একসময় এই অংশে (CMB) একত্রিত ছিল।  শুধু তাই নয়, মহাবিশ্বের যে চারটি মৌলিক বল (মহাকর্ষ বল, তড়িৎচৌম্বকীয় বল, দুর্বল নিউক্লিও বল ও সবল নিউক্লিয় বল) রয়েছে তার সবগুলোই এখানে একত্রিত ছিল। প্রশ্ন হলো কিভাবে চারটি বল একত্রে ছিল? এই প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যেহেতু কণাগুলো একত্রিতভাবে ক্ষুদ্র জগতে ছিল তাই এই একত্রিত হওয়ার ঘটনার সাথে অবশ্যই কোয়ান্টাম জগতের কোনো সংযোগ রয়েছে। এজন্য বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম গ্রাভিটি নামক একটি থিওরির প্রস্তাব করেন, যে থিওরি এই একত্রিত হওয়ার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারবে।


চিত্র ৪ : ক্যাপশন

তবে জেনে রাখা ভালো যে- কোয়ান্টাম গ্রাভিটি এখনো অগ্রসর হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারে নি। তাই এই থিওরি নিয়ে অতো বেশি কিছু বলার মতো এখনো সময় আসেনি। একইভাবে ব্ল্যাকহোলে কিভাবে সকল ভর একত্রিত থাকে তার ব্যাখ্যাও বিজ্ঞানীরা দিতে পারেনি।
কোয়ান্টাম গ্রাভিটির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ বলের জন্য একটি কণাকে দায়ী মনে করেন। আর সেই কনার নাম গ্রাভিটন। গ্রাভিটন হলো মহাকর্ষ বলবাহী কণা। সর্বপ্রথম ১৯৩৪ সালে সোভিয়েত পদার্থবিজ্ঞানী দিমিত্রি ব্লোখিনসেভ এবং গেল পারিনা গ্রাভিটি কণার নামকরণ করেন। তারা যে গ্রাভিটন কণার প্রস্তাব করেন তার গতি আলোর গতির চেয়েও বেশি ছিল। তাদের এই প্রস্তাব বিজ্ঞানসমাজে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এরপরেও অনেক গবেষণা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের কথা হলো- আজ পযন্ত গ্রাভিটন কণা আবিষ্কার হয়নি আর কোয়ান্টাম গ্রাভিটিও তেমন অগ্রসর হয়নি। তাই কোয়ান্টাম গ্রাভিটি তত্ত্ব এখনো অসফল রয়েই গেলো। 
একটা বিষয় জেনে রাখা ভালো। এখানে কোনো তত্ত্ব ভুল অথবা এক তত্ত্বের সাপেক্ষে অন্য তত্ত্ব ভুল এটা বলা যাবে না। কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তত্ত্ব কখনো ভুল হয়না। এক ক্ষেত্রের তত্ত্ব অন্য ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে, তাই সে ক্ষেত্রে ওই তত্ত্বকে ভুল বলা যাবে না। সেটাকে তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা অথবা দুর্বলতা বলা হয়।

(বিঃদ্রঃ আরো অনেক ধরণের গ্রাভিটি মডেল ও তত্ত্ব আছে, তবে সেগুলো অত জনপ্রিয় নয় তাই উল্লেখ করিনি)

লেখক:
অন্তর চন্দ্র 

তথ্যসূত্র:
Graviton - Wikipedia
Cosmic microwave background - Wikipedia
Introduction to general relativity - Wikipedia

Post a Comment

0 Comments