ভুতুড়ে কণার কেচ্ছা

প্রাচীন গ্রীসের পড়ন্ত বিকেলে সক্রেটিস নামের এক পণ্ডিত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতেন। বিচিত্র সব বিষয়ে তার সেই কথাগুলো ছিলো অমূল্য। জ্ঞানপিপাসুরা সেই জ্ঞান লুফে নিতেন। ব্যাপারটা অত্যন্ত রকমের সুন্দর এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়!

গেল রোববার, কোচিং শেষে রিকশায় করে বাসায় ফিরছি। গুলিস্তান পর্যন্ত এসেই দেখি রাস্তার মোড়ে বেশ ভিড় জমেছে। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা গেলনা। তবে, এটুকু শোনা যাচ্ছে যে কেউ হয়তো উচ্চস্বরে কিছু একটা সবাইকে বোঝাচ্ছে। সক্রেটিসের স্মৃতি রোমন্থন করলাম। দেড় মিনিট গুতোগুতি, ভিড়হট্ট ঠেলেঠুলে অতিকষ্টে সামনে গিয়ে দেখি,একজন কবিরাজ গোছের লোক হাত-পা নেড়েচেড়ে তার ছোটবেলার ভুত দেখার গল্প অত্যন্ত গম্ভীরভাবে আলোচনা করছেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে আমিও সেই দলে পড়ে গল্প গিলতে লাগলাম।

কবিরাজি ভুতের কয়েকটা কমন বৈশিষ্ট্য হলো- ভুত গুলো চোখের পলকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সহজেই চলে যায়, এদের ধরা খুবই মুশকিল, ইচ্ছা মতো চলাফেরা করতে পারে। দেয়াল, পাহাড় কোনো কিছুই এদের আটকাতে পারেনা, দুর্দান্ত গতি! আমার ভিড়ের মধ্যে চেচিয়ে বলতে ইচ্ছা করলো, "আপনার দেখা ওগুলো ভুত নয়, আপনার কথা গুলো সত্যি হয়ে থাকলে ওগুলো নিউট্রিনো!"

নিউট্রিনো যেন এক অতি আশ্চর্য বস্তুর নাম! আলাদিনের দৈত্যও যেন এর কাছে হার মানে। আলাদিন, আলাদিনের চেরাগ, দৈত্য এসব তৈরি হয় পরমাণু দিয়ে। পরমাণু তৈরি হয় ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে। প্রোটন এবং নিউট্রনরা কিন্তু মৌলিক কণিকা নয়। কারণ এদের ভাঙলে পাওয়া যাবে কোয়ার্ক। একটা সময় অবশ্য নিউট্রন, প্রোটন এদের মৌলিক কণিকা ভাবা হতো। নিউট্রনরা চার্জনিরপেক্ষ, লোভনিরপেক্ষ, সৎ ও পরোপকারী! ধনাত্মক চার্জবিশিষ্ট হিংসুটে প্রোটনদের এরা যত্নসহকারে বেধে রাখে।

তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোর বিকিরণের ফলে নিউট্রনগুলো গৃহত্যাগী হতে থাকে, নিউক্লিয়াস ত্যাগ করে উন্মুক্ত হতে থাকে। ফলে প্রোটনকে ধরে রাখার মতো নিউট্রন কমে যেতে থাকে। প্রোটনরাও আস্তে আস্তে বিকর্ষণ শুরু করতে থাকে। তাই তেজস্ক্রিয় পদার্থ ক্রমেই অন্য কোনো পদার্থে রূপান্তরিত হতে থাকে। ত্রিশের দশকে বিজ্ঞানীরা হঠাৎ খেয়াল করেন, পরমাণু থেকে নিউট্রন আলাদা হয়ে গেলে নিউট্রনটি আর নিউট্রন থাকছে না। সেটি ভেঙে গিয়ে ইলেকট্রন ও প্রোটনে পাল্টে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটা কাণ্ড।

কিন্তু এখানেই ঘটলো এক বিপত্তি। নিউট্রন ভেঙ্গে যে ইলেক্ট্রন আর প্রোটন-এর উদয় হলো, পুনরায় এই প্রোটন আর ইলেক্ট্রনের ভর যোগ করলে তো সেই নিউট্রনের ভরের সমান ভর পাওয়ার কথা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলেন, তা হচ্ছেনা। অদ্ভুত এই কান্ডের সাথে সাথে ভর যাচ্ছে পরিবর্তিত হয়ে। আগে নিউট্রনের যে ভর ছিল তা থাকছে না, যাচ্ছে কমে।

যদি কমেই যায় তবে সেই ভর গেল কোথায়? এ যেন এক ভুতুড়ে কাণ্ড! ভর ও শক্তির নিত্যতা সূত্র অক্ষুণ্ণ রাখতে, বাধ্য হয়েই পদার্থবিজ্ঞানের অনন্য পণ্ডিত উলফগ্যাং পলি একটি অজানা কণার অস্তিত্ব ভবিষ্যৎবাণী করেন।

তখনকার সময়ে প্রযুক্তিগতভাবেও তারা অতটা উন্নত হয়ে ওঠেনি। কয়েক বছর পরে পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল এনরিকো ফার্মি মহাশয় তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের একটি তত্ত্ব প্রদান করেন। ওই তত্ত্বে স্থান পায় বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পলির ভবিষ্যৎবাণী করা সেই কণিকা। বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি এই অজানা কণাটির নাম দেন নিউট্রিনো!

ফোটনরা নিতান্তই সহজসরল। দারুণ গতিতে ছুটে যায় আপন মনে, নিজের খেয়ালে। নিউট্রিনোরা চলে ভুতের পালকি চড়ে। ফোটনের কাছাকাছি বেগে ছুটে চলে ভুতেদের বেয়ারা। ফোটনের চলার পথে কোনো অসচ্ছ বাধা আসলে ফোটনের চলা ওইখানেই শেষ, বড়জোড় প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে।

নিউট্রিনোরা কিন্তু এমনি এক আজিব কিসিম, যেটার সামনে হাজার বাধা থাকলেও তা ভেদ করে অনায়াসে বেরিয়ে যেতে পারে। কি পাহাড়, কি পর্বত, কি কবিরাজের তাবিজ! নিউট্রিনোকে আটকায় হিম্মত কার? এমনকি, এখনো আমাদের শরীরের ভিতর দিয়ে, মাথার ভিতর দিয়ে, আমাদের হাতের ডিভাইসটার ভিতর দিয়ে, আলাদিনের হাতের চেরাগের ভিতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ নিউট্রিনো! আসে কোত্থেকে এত নিউট্রিনো? 

নিউট্রিনো ভুতের উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো নক্ষত্রগুলো। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্য। সূর্যের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণে নিউট্রিনো উন্মুক্ত হয়। সেসব নিউট্রিনো হরহামেশাই ছুটে আসে আমাদের দিকে। আর একেকটা সুপারনোভা বিস্ফোরণে যে কী পরিমাণে নিউট্রিনো ছড়িয়ে পড়ে তা কল্পনারও অতীত! পৃথিবীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎচুল্লীতে উৎপন্ন হয় নিউট্রিনো, পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণেও উৎপন্ন হয় নিউট্রিনো! ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নিউট্রিনোরা খিলখিল করে হেসে বেড়ায়, ছুটে বেড়ায়! কে এই নিউট্রিনো? কী তার বংশপরিচয়?

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে হাতি, ঘোড়া, আলাদিন, পাহাড়-পর্বত, নটেশাকসহ ব্রহ্মাণ্ডের সকল বস্তু গঠিত হয়েছে কোয়ার্ক, বোসন আর লেপটন দিয়ে। এই লেপটনরাই ভুতুড়ে, ভুতের মতো লেপ্টে থাকে বলে এদের নাম লেপটন। লেপটন দুই ধরনের, ইলেকট্রন আর নিউট্রিনো। নিউট্রিনোরা ভুতুড়ে হওয়া সত্ত্বেও এদের শিং নেই, দাঁত নেই, নখ নেই এমনকি এদের চার্জও নেই।

আমাদের দেশে যেরকম আচমকা বিনাকারণেই ভুত দেখার গল্প শোনা যায়, নিউট্রিনোরা দেশি ভুতেদের মতো এরকম হামেশা ভয় দেখায় না। কারণ, এরা কারো সাথে খাতির করেনা। বিদ্যুৎ-চুম্বকক্ষেত্র দ্বারাও প্রভাবিত হয় না নিউট্রিনো। বিজ্ঞানীরা পড়ে যান মহা ফ্যাসাদে। এমন আচরণ করলে এই কণা নিয়ে সংসার করাই দায়! শেষের দিকে নিউট্রিনোর ভর উল্লেখ করলাম। কারণ, এত যার হম্বিতম্বি, তার ভর নেহাতই কম।

ভুতুড়ে কণা নিউট্রিনোর স্পিন ১/২ কিন্তু ভর এখনো সুনির্দিষ্ট নয়। তবে, মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা জানতে পারি, এই তিন ধরনের নিউট্রিনোর (ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউ নিউট্রিনো, টাউ নিউট্রিনো) ভরের সমষ্টি (<2.14 × 10^−37 kg) ইলেকট্রন ভরের এক মিলিয়নের কম। অথবা, সবচেয়ে ছোট নিউট্রিনোর সর্বোচ্চ ভর ইলেকট্রনের ভরের ছয় মিলিয়ন ভাগেরও কম। তবে অনেকের মতে নিউট্রিনোর আসলে কোনো ভরই নেই অর্থাৎ আলোর কণার মতো ভরহীন।

অদ্ভুতুড়ে কণারা একদিন ঠিকই বিজ্ঞানীদের হাতে ধরা দেবে। ভুতের পালকি এসে থামবে নিউট্রিনো ডিটেক্টরের প্রাসাদে। লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারের উন্মত্ত ধারায় ভিজতে থাকবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সরা। ততদিন পর্যন্ত রাস্তা ঘাটে ভুতেদের তামাশা চলতেই থাকবে!

সক্রেটিসকে স্বরণ করে ভিড় ঠেলে আবার রিকশায় উঠলাম। গুলিস্তানের মায়াবী বিকেলে লক্ষ লক্ষ নিউট্রনো কোয়ান্টাম জগৎ আলোড়িত করতে লাগল।



তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া


লেখক:
স্বর্ণজিৎ বালা

Post a Comment

0 Comments